ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: লেবাননে কয়েকদিনের তীব্র সংঘাতের পর শুক্রবার বিকেল ৪টা (গ্রিনিচ মান সময় ১৩০০) থেকে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের অন্তর্বর্তী সমঝোতাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল।
রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা এবং হিজবুল্লাহর দুটি সূত্রও যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।ইসরায়েলি ওই কর্মকর্তা বলেন, হিজবুল্লাহ যদি আমাদের ওপর হামলা না চালায়, তাহলে আমাদের জন্যও এটি যুদ্ধের সময় নয়। তবে তিনি জানান, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনারা অবস্থান বজায় রাখবে।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরও সীমান্তের ওপারে লেবাননে ইসরায়েলি হামলার দৃশ্য দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন উত্তর ইসরায়েলে অবস্থানরত রয়টার্সের এক সাংবাদিক। সীমান্তবর্তী একটি লেবানিজ গ্রামের পাশ থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শুক্রবার মধ্যরাতের পর থেকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, যুদ্ধের অন্যতম প্রাণঘাতী হামলায় দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর আক্রমণে ইসরায়েলের চার সেনা নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে তেল আবিব।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা। তবে চুক্তি ঘোষণার পর শুরুতে সহিংসতা কমে এলেও সপ্তাহজুড়ে আবার সংঘর্ষ বেড়ে যায়।
হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ এর আগে রয়টার্সকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি ছাড়া ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে ইরান গোষ্ঠীটিকে জানিয়েছে।
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরানের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা এই যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করেছেন।
তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। আজকের গোলাগুলির পর উভয় পক্ষ এখন যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে বলে আমরা বুঝতে পারছি।
চলতি সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে, তার আলোচনায় ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে দেশটি। গত ২ মার্চ তেহরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে সীমান্তে হামলা চালানোর পর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের ওই কর্মকর্তা বলেন, নিজেদের বাহিনী ও ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে যেকোনো নতুন হুমকির জবাব দেওয়ার স্বাধীনতা তাদের থাকবে।এর আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চার সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় হিজবুল্লাহকে “চড়া মূল্য” দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তাদের উদ্বেগের যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি।
প্রাণঘাতী হামলা
ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহ বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় গোষ্ঠীটির সদস্য ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে।
তবে হিজবুল্লাহ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বরং তারা দাবি করেছে, ইসরায়েলই যুদ্ধবিরতি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির শর্ত বারবার লঙ্ঘন করছে। গোষ্ঠীটির অভিযোগ, ইসরায়েলি হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছে, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস করা হচ্ছে এবং স্থল অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।
কৌশলগত পাহাড় ঘিরে তীব্র লড়াই
লেবাননের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতভর লিতানি নদীর উত্তরে আলি আল-তাহের পাহাড় এলাকায় তীব্র যুদ্ধ হয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই উচ্চভূমির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছিল ইসরায়েলি বাহিনী।
হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তাদের যোদ্ধারা ওই এলাকায় অগ্রসর হওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তিনটি মেরকাভা ট্যাংক ধ্বংস করেছে এবং রকেট ও কামানের গোলা নিক্ষেপ করেছে। পরে হতাহত সেনাদের সরিয়ে নিতে আসা বাহিনীকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি।
ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের একটি অংশকে নিজেদের ঘোষিত নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে নিয়েছে। তাদের দাবি, উত্তর ইসরায়েলকে হিজবুল্লাহর হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। এ লক্ষ্যে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে হিজবুল্লাহর উপস্থিতি রয়েছে বলে দাবি করছে তেল আবিব।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহও চলতি সপ্তাহে দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি অবস্থান লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলায় কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা নিহত ও আহত হয়েছেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৯১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৭৪৬ জন চিকিৎসাকর্মী, নারী ও শিশু রয়েছেন।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে চলমান এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩২ জন ইসরায়েলি সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি