| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

জনতার আলবেনিয়া বনাম ফ্লেমিঙ্গোর আবাসস্থলে ট্রাম্প-কুশনারের কোটি ডলারের সাম্রাজ্য

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ০৬, ২০২৬ ইং | ২১:২৩:৫০:অপরাহ্ন  |  ৩৫৩ বার পঠিত
জনতার আলবেনিয়া বনাম ফ্লেমিঙ্গোর আবাসস্থলে ট্রাম্প-কুশনারের কোটি ডলারের সাম্রাজ্য

আশিস গুপ্ত: 

আলবেনিয়ার সমুদ্রসৈকত, গণসম্পদ এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোনো ধনকুবেরের বিক্রি বা কেনাবেচার বস্তু হতে পারে না—এই দৃপ্ত স্লোগানকে ভিত্তি করেই প্রায় দুই মাস ধরে রাজপথে নেমেছেন আলবেনিয়ার সাধারণ মানুষ। ট্রাম্প-কুশনানের বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট প্রজেক্টের নামে দেশের উপকূলীয় প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও সরকারি জমি হস্তান্তরের ষড়যন্ত্র এবং প্রধানমন্ত্রী এডি রামায় নেতৃত্বাধীন সরকারের সেটির পথ সুগম করার বিরুদ্ধে যে তীব্র জনরোষ তৈরি হয়েছে, তা আজ এক বিশাল গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। সাধারণ মানুষ ও পরিবেশকর্মীরা এই আন্দোলনকে নাম দিয়েছেন 'ফ্লেমিঙ্গো প্রোটেস্ট' বা ফ্লেমিঙ্গো প্রতিরোধ। আন্তর্জাতিক মূলধনের আগ্রাসন এবং রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারী আঁতাতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আলবেনিয়ার সচেতন জনতা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—জলকামান, টিয়ারগ্যাস কিংবা গণগ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে এই গণজাগরণকে কোনোভাবেই স্তব্ধ করা যাবে না।

গত ২৭ জুলাই দেশটির রাজধানী তিরানায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে যে নজিরবিহীন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তা আলবেনিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করেছে। সেদিন সংসদ ভবন ঘেরাও করা বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ নির্বিচারে পেপার স্প্রে প্রয়োগ করে এবং ব্যাপক লাঠিচার্জের পর বহু আন্দোলনকারীকে আটক করে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আন্তর্জাতিক বামপন্থী সংহতি মঞ্চ 'প্রোগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল'-এর অন্যতম শরিক দল 'লেভিজ্যা বাশকে' (Lëvizja Bashkë)-এর শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বও ছিলেন। বিক্ষোভকারীদের একমাত্র দাবি ছিল—প্রধানমন্ত্রী এডি রামায়ের অবিলম্বে পদত্যাগ এবং ট্রাম্প-কুশনার গোষ্ঠীর সাথে করা সমস্ত অগণতান্ত্রিক জমি হস্তান্তর চুক্তি বাতিল করা। সপ্তাহ পর সপ্তাহ ধরে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস, তীব্র জলকামান এবং নির্বিচার গ্রেফতার সত্ত্বেও আলবেনিয়ার জনতা রাজপথ ছেড়ে যাননি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ব্যক্তিগত ইকুইটি ফার্ম অ্যাফিনিটি পার্টনার্স এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাটলান্টিক ইনকিউবেশন পার্টনার্স আলবেনিয়ার সাযান দ্বীপ ও জভের্নেক উপকূলীয় অঞ্চলে এক বিশাল বিলাসবহুল পর্যটন প্রকল্পের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের মোট প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ সাযান দ্বীপের অংশের জন্যই প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার এবং পার্শ্ববর্তী সুরক্ষিত জভের্নেক এলাকায় অতিরিক্ত আরও প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এডি রামায়ের নেতৃত্বাধীন স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট কমিটি এই প্রকল্পকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে, যার ফলে এটি বিশেষ আইনি সুবিধা ও দ্রুত সরকারি ছাড়পত্র পাচ্ছে। সরকারি সংস্থা অ্যালবেনিয়ান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অংশীদারিত্বে একটি যৌথ আইনি সত্তা গঠন করে এই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি নির্মাণ ও পরিচালন পর্যায়ে প্রায় এক হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভৌগোলিক দিক থেকে আড্রিয়াটিক ও আইওনিয়ান সাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত সাযান দ্বীপটি প্রায় ৫৬২ হেক্টর বা ৫.৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। একসময় এটি কমিউনিস্ট আমলে ইতালি, সোভিয়েত ও আলবেনীয় বাহিনীর অধীনে একটি নিবিড় সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো, কিন্তু এই নতুন পরিকল্পনার অধীনে দ্বীপটির প্রায় ৪৫ হেক্টর জমি অর্থাৎ মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৮ শতাংশ প্রথম ধাপে হোটেল ও আবাসিক ভিলা নির্মাণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। কুশনানের এই মেগা-প্রকল্পের প্রধান আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের বিলাসবহুল রিসোর্ট, প্রাইভেট কেনাবেচার জন্য প্রিমিয়াম আবাসিক ভিলা, বিশাল প্রমোদতরী বা ইয়াট নোঙর করার জন্য একটি আধুনিক মেরিনা এবং বিশ্বমানের রেস্তোরাঁ ও গ্যাস্ট্রোনমিক জোন।

যদিও সরকারের দাবি এই প্রকল্প আলবেনিয়াকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একটি শীর্ষস্থানীয় উচ্চমানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করবে, তবুও এর বিরুদ্ধে ব্যাপক পরিবেশগত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাযান দ্বীপ এবং পার্শ্ববর্তী নার্তা লাগুন ও জভের্নেক এলাকা পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বাস্তুসংস্থানের অংশ, যা দুর্লভ পরিযায়ী ফ্লেমিঙ্গো পাখিসহ বহু বন্য প্রাণীর প্রধান প্রজনন ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল। বিপুল পরিমাণ যান্ত্রিক নির্মাণ কাজ ও পর্যটকদের আগমনে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ধ্বংসের মুখে পড়বে বলে সতর্ক করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থা ইউরোনাচারের নির্বাহী পরিচালক গাব্রিয়েল শোয়াডেরার স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, "সাধারণ মানুষের জন্য নামমাত্র উপকারে আসবে এমন সব বিলাসবহুল পর্যটন প্রকল্প প্রসারের পরিবর্তে আলবেনীয় সরকারের উচিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করা"। অন্যদিকে প্রতিবাদী তরুণ আন্দোলনকারীদের মতে, দেশীয় সম্পদ ও ঐতিহ্যের বাণিজ্যিকীকরণের মধ্য দিয়ে আলবেনিয়াকে সাধারণ মানুষের বসবাস অযোগ্য করে কেবল বিদেশি ধনকুবেরদের বিলাস ক্ষেত্র বানানোর চেষ্টা চলছে।

রাষ্ট্রীয় পুলিশবাহিনী যতই সহিংস উপায়ে রাজপথ খালি করার চেষ্টা করুক না কেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, শ্রমিকদের সংহতি এবং পরিবেশকর্মীদের একাত্মতা এই আন্দোলনকে নতুন ভিত্তি দিয়েছে। সংসদ ভবনের বাইরে পুলিশের কাঁটাতারের বেড়া আর পেপার স্প্রের মুখোমুখি হয়েও বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, আলবেনিয়ার জমি ও ভবিষ্যৎ ট্রাম্প-কুশনারের মতো ধনকুবের কিংবা এডি রামায়ের মতো রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। টিয়ারগ্যাস ও গ্রেফতারি পরোয়ানা দিয়ে সাময়িকভাবে আন্দোলনকারীদের শারীরিকভাবে আটক করা গেলেও যে আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার আগুন আলবেনিয়ার রাজপথে জ্বলে উঠেছে, তাকে কোনো কারাগারের দেওয়ালে বন্দি করে রাখা সম্ভব নয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, দিল্লি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪