| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

রাজনৈতিক উত্তেজনায় শেষ পর্যন্ত কার লাভ, আর কার ক্ষতি?

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ০৬, ২০২৬ ইং | ০০:৫৫:০২:পূর্বাহ্ন  |  ১৬৮৫ বার পঠিত
রাজনৈতিক উত্তেজনায় শেষ পর্যন্ত কার লাভ, আর কার ক্ষতি?

সীমান্ত আরিফ : বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিদিনের সংবাদ কেবল রাজনৈতিক ঘটনার বিবরণ নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন প্রশ্নও তৈরি করছে। জুলাই-পরবর্তী যে পরিবর্তনকে অনেকে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখেছিলেন, সেই পরিবর্তনের দুই বছর পর জনপরিসরে এখন একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—"আমরা কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি, নাকি পুরোনো সংঘাতের রাজনীতিই নতুন রূপে ফিরে আসছে?"

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার খবর জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো একে অপরকে দায়ী করেছে। তাই এসব ঘটনার সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার। তবে একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই—শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত বাড়লে তার প্রভাব শুধু ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটি জাতীয় রাজনীতির ওপরও পড়ে।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক সহনশীলতার নতুন সংস্কৃতি। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, মতাদর্শের প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে কমবে। তাই সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলো স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় প্রশ্ন তুলেছে—এই উত্তেজনা কি জুলাইয়ের প্রত্যাশাকে দুর্বল করছে?

জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক। কে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে, কারা সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে এবং রাজনৈতিকভাবে কে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে—এসব নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতারা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রকাশ্যে বলেছেন, বিপ্লবের দুই বছর পরও সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত স্বস্তি পুরোপুরি ফিরে আসেনি। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন যে আন্দোলনের রাজনৈতিক অর্জন নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এটি তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন, তবে এই বক্তব্য জনমনে বিদ্যমান কিছু প্রশ্নের প্রতিফলনও বটে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, "জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার সংগ্রাম শুরু হয়েছে।" তাঁর বক্তব্যে মূল উদ্বেগ ছিল, আন্দোলনের উদ্দেশ্য, ত্যাগ ও সংস্কারের প্রত্যাশা যেন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আড়ালে হারিয়ে না যায়। এই মন্তব্যও রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—রাজনীতি কি আন্দোলনের লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে, নাকি আন্দোলনের স্মৃতি নিয়েই প্রতিযোগিতা বেশি হচ্ছে?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, বড় গণআন্দোলনের পর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় সেই আন্দোলনের মূল্যবোধ ধরে রাখা। আন্দোলনের সময় ঐক্য গড়ে ওঠে একটি অভিন্ন লক্ষ্যকে সামনে রেখে। কিন্তু ক্ষমতা, নির্বাচন, সংগঠন বিস্তার এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় সেই ঐক্য ধরে রাখা অনেক কঠিন হয়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি এই বাস্তবতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির জায়গা। যদি শিক্ষার্থীরা যুক্তি, বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার বদলে সংঘর্ষ ও সহিংসতার অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয়, তাহলে সেই সংস্কৃতি একসময় জাতীয় রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি প্রশ্নও জনপরিসরে ঘুরে ফিরে আসছে—"বাংলাদেশ কি আবার এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে যাচ্ছে, যেখানে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গা সংকুচিত হবে?"

এই প্রশ্নের সরল উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এক বা দুটি ঘটনার ওপর নির্ভর করে না। তবে ইতিহাস একটি শিক্ষা দেয়: যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়মতান্ত্রিক থাকে, আইনের শাসন শক্তিশালী হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষভাবে কাজ করে, তখন গণতন্ত্রও শক্তিশালী হয়। আর যখন সংঘাত, অবিশ্বাস ও অসহিষ্ণুতা বাড়ে, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়ে।

এই কারণেই "ফ্যাসিবাদ ফিরে আসছে"—এ ধরনের বড় রাজনৈতিক মূল্যায়ন করার আগে প্রয়োজন তথ্য, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ। তবে এটুকু বলা যায়, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি রক্ষার জন্য যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন বা আইনের অসম প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।

বর্তমান সরকারের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। জনগণ কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় আইনের সমান প্রয়োগ, নিরপেক্ষ প্রশাসন, নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন এবং জবাবদিহিমূলক শাসন। একইভাবে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে সমালোচনাকে তথ্যভিত্তিক রাখা এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়া।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি রাজনৈতিক দলগুলোর লাভ-ক্ষতির নয়। যদি রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ে, যদি শিক্ষাঙ্গন অস্থির হয়, যদি জনআস্থা দুর্বল হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের, গণতন্ত্রের এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। আর যদি সব রাজনৈতিক শক্তি সংলাপ, আইনের শাসন এবং সহনশীল প্রতিযোগিতার পথে ফিরে আসে, তাহলে সবচেয়ে বড় লাভও হবে বাংলাদেশের।

জুলাইয়ের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে না কে বেশি কৃতিত্ব নিল, বা কে বেশি রাজনৈতিক সুবিধা পেল—বরং নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কতটা ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এগোতে পারল, তার ওপর। সেই পরীক্ষায় জয়ী হওয়াই আজ সব রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

সীমান্ত আরিফ : কলাম লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪