স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে বলে সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। শুধু মাছের পাকস্থলী বা পরিপাকতন্ত্রেই নয়, মাছের মাংসপেশিতেও অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের এমন যে-কোনো কণা, যার প্রস্থ পাঁচ মিলিমিটারেরও কম। বড় প্লাস্টিক ভেঙে, সিনথেটিক কাপড়ের তন্তু, টায়ারের ক্ষয়, প্রসাধনী বা শিল্পবর্জ্য থেকে এসব কণা তৈরি হয়ে নদী, খাল, হ্রদ ও সাগরে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে খাদ্য ও পানির মাধ্যমে এগুলো মাছের শরীরে প্রবেশ করে।
গবেষকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছের পরিপাকতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় মাছের মাংসপেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ মানুষ মাছের এই অংশটিই মূলত খায়।
তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মানেই যে তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি গবেষকরা। মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব, কী পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক ক্ষতিকর এবং কীভাবে ঝুঁকি তৈরি হয়, তা নিয়ে এখনো বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক গবেষণায় আড়িয়ল বিলের পাঁচ ধরনের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। সেগুলো হলো- কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি – যা মূলত দেশি মাছ হিসেবে পরিচিত। এগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে ‘সর্বভুক’ কই মাছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাক মো. শাহজাহান, এই গবেষণা দলের প্রধান, বলেছেন যে মাছগুলোর মাংসপেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। মূলত, মাছের অন্ত্র বা পাকস্থলীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া খুব অস্বাভাবিক নয়। কারণ মাছ খাবার ও পানির সঙ্গে এসব কণা গ্রহণ করে, যা পরিপাকতন্ত্রে জমা থাকতে পারে। মাছের খাবারের মাঝে থাকতে পারে পানি, ছোট মাছ, প্ল্যাঙ্কটন, এমনকি কাদা-মাটি। তবে মানুষ সাধারণত মাছের নাড়িভুঁড়ি নয়, মাংসপেশিই বেশি খায়। তাই মাছের মাংসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি গবেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তাহলে খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ কোনগুলো? ছোট মাছ নাকি বড় মাছ? জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ছোট মাছ সাধারণত অন্ত্রসহ-ই খেয়ে ফেলে মানুষ। সেই যুক্তিতে ছোট মাছেই সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার কথা। তবে কোন মাছে এটা বেশি আছে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।"
উল্লেখ্য, ‘স্পেশিও টেম্পোরাল ডাইনামিকস অ্যান্ড রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট অব মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন ওয়াটার, সেডিমেন্ট অ্যান্ড ফিশ ফ্রম অ্যা ক্রিটিক্যাল ওয়েটল্যান্ড ইকোসিস্টেম: আরিয়াল বিল, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি করার জন্য বর্ষা, শীত ও শুষ্ক – তিনটি মৌসুমে আড়িয়ল বিলের পাঁচটি স্থান থেকে পানি ও তলানির নমুনা সংগ্রহ করার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি, পাঁচ প্রজাতির ১৫০টি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি বিশ্লেষণ করে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয় বলেও গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকরা জানান, পানি ও তলানি উভয় জায়গাতেই উপস্থিতি পাওয়া গেলেও তলানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি ছিল। আর শীতকাল বা শুষ্ক মৌসুমে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়।
মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বুড়িগঙ্গা নদীর নাম বারবার আসে। অধ্যাপক মো. শাহজাহানও বলছিলেন যে বুড়িগঙ্গার দূষিত পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ অনেক।
ওই নদীর মাছেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। তবে ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জ জেলায় অবস্থিত ২৬০ বর্গমাইল আয়তনের আড়িয়ল বিলে দূষণ অনেক বেড়ে গেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক মো. শাহজাহান বলেন, বিলটির সব সংযোগ চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে এবং এ ব্যাপারে তারা সরকারকেও জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক দলটি এর আগে ব্রহ্মপুত্র, চলনবিল ও হাওরাঞ্চল এবং সমুদ্রের মাছ নিয়ে গবেষণা করেছে এবং সবগুলো জায়গার মাছেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছে। এ ব্যাপারে অধ্যাপক শাহজাহান বলেন, ‘তবে সমুদ্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি থাকে। সমুদ্র বিশাল হলেও সমস্ত ময়লা আবর্জনা, পানি শেষমেশ গিয়ে সেখানেই জমা হচ্ছে।
তিনি জানান, শুঁটকিতে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
‘ড্রাইড ফিশ মোর প্রোন টু মাইক্রোপ্লাস্টিকস কনটামিনেশন ওভার ফ্রেশ ফিশ: হায়ার পটেনশিয়াল অব ট্রফিক ট্রান্সফার টু হিউম্যান বডি শীর্ষক গবেষণাটি করার জন্য ওই গবেষক দল কুয়াকাটা ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে তাজা মাছ ও শুঁটকি সংগ্রহ করেছিলো। ওই গবেষণায় শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ফাইবার ধরনের কণা।
চলনবিল ও হাওরাঞ্চল নিয়ে করা ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস অকারেন্স ইন ওয়াটার, সেডিমেন্ট অ্যান্ড এডিবল স্মল ইন্ডিজেনাস ফিশ স্পিসিজ ইন সিজনাল ফ্রেশওয়াটার ওয়েটল্যান্ড ইকোসিস্টেমস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত হয়।
তাতে বলা হয়েছে, এই ধরনের জলাভূমির মাছে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে মাইক্রোফাইবার ধরনের এবং বর্ণহীন মাইক্রোপ্লাস্টিক। একই সঙ্গে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন ও পলিস্টাইরিন ধরনের প্লাস্টিক সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে।
২০২৩ সালে ‘প্রেভেলেন্স অব মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন কমনলি কনজিউমড ফিশ স্পিসিজ অব দ্য রিভার ওল্ড ব্রহ্মপুত্র, বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশ করেছিলো তারা।
তখন ব্রহ্মপুত্র নদের উজান, মধ্যভাগ ও ভাটির বিভিন্ন স্থান থেকে পাঁচটি মাছ সংগ্রহ করা হয়েছিলো এবং তখন সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয় বাইম মাছে।
ওই গবেষণায় বলা হয়েছিলো, আকার ও ওজনে বড় মাছের অন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। এছাড়া, ভাটি অঞ্চলের মাছেও এর উপস্থিতি বেশি ছিল।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব