তাওহীদাহ্ রহমান নূভ:
২৬শে মার্চ—এ দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির অস্তিত্বের অন্তঃস্থলে জ্বলে থাকা এক অমর প্রদীপ, এক অনিঃশেষ আলোকস্তম্ভ। ইতিহাসের গহ্বর থেকে উঠে আসা এই দিবস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক প্রাপ্তি নয়, বরং তা এক দীর্ঘ, রক্তাক্ত, তবু গৌরবময় অভিযাত্রার পরম অর্জন। ১৯৭১ সালের এই প্রভাতে, পরাধীনতার ঘন অন্ধকার বিদীর্ণ করে বাংলার আকাশে উদিত হয়েছিল মুক্তির রক্তিম সূর্য—যার প্রতিটি রশ্মিতে লুকিয়ে ছিল সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অমোঘ প্রত্যয়ের দীপ্তি।
সেই মাহেন্দ্রক্ষণে বাঙালির শতাব্দীপ্রাচীন বঞ্চনা, নিপীড়ন আর অবদমিত ক্রোধ এক অভূতপূর্ব জাগরণে বিস্ফোরিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না কেবল একটি রাজনৈতিক আহ্বান; তা ছিল এক জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার শপথ, এক অবিনাশী আত্মমর্যাদার পুনর্জন্ম। তাঁর সেই আহ্বান রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল কোটি মানুষের; একটি নিপীড়িত জনপদ মুহূর্তেই রূপ নিয়েছিল দুর্বার প্রতিরোধের দুর্গে।
কিন্তু এই আলোকোজ্জ্বল প্রভাতের পূর্বসূরি ছিল ২৫শে মার্চের সেই বিভীষিকাময় কালরাত্রি—এক দুঃসহ, রক্তাক্ত অধ্যায়, যেখানে মানবতা হয়েছিল পদদলিত, আর সভ্যতার মুখোশ ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল নির্মম বর্বরতায়। নিরস্ত্র মানুষের ওপর চালানো হয়েছিল নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ; রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল শহরের পথ, নিভে গিয়েছিল অগণিত স্বপ্নের প্রদীপ। তবু সেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক অদম্য প্রতিরোধস্পৃহা—যেন ছাইয়ের ভেতর থেকে উঠে আসা ফিনিক্স পাখি, আরও শক্তিশালী, আরও অপ্রতিরোধ্য।
স্বাধীনতা আমাদের কাছে কোনো দয়ার দান নয়—এটি অর্জিত হয়েছে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে, লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বেদনাদগ্ধ ইতিহাসে, অগণিত মুক্তিযোদ্ধার আত্মোৎসর্গে। এই রক্তঋণ চিরন্তন, এই ত্যাগ অনির্বচনীয়। সেই রক্তস্নাত পথ বেয়ে আজ আমরা অতিক্রম করেছি ৫৪টি বছর—সময়ের স্রোতে বহমান থেকেও যার প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিধ্বনিত হয় একাত্তরের সেই গর্জন।
এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চে এক বিস্ময়কর রূপান্তরের প্রতীক। একদা অবহেলিত, শোষিত ও দারিদ্র্যপীড়িত এই ভূখণ্ড আজ উন্নয়নের অভিযাত্রায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কৃষি থেকে শিল্প, শিক্ষা থেকে প্রযুক্তি—প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে চলেছি দৃঢ় পদক্ষেপে। পদ্মার তীর থেকে যমুনার ঢেউ, নগরের অট্টালিকা থেকে গ্রামবাংলার সবুজ প্রান্তর—সবখানেই যেন শোনা যায় উন্নয়নের এক অবিরাম জয়গান। এই অগ্রযাত্রার মূলশক্তি সেই একাত্তরের চেতনা—স্বাধীনতার প্রতি অবিচল আস্থা এবং নিজের সক্ষমতার প্রতি অদম্য বিশ্বাস।
তবুও, এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জনের মাঝেও আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা অনিবার্য। স্বাধীনতা কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা অর্জনের নাম নয়; এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায়। আমরা কি সত্যিই সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পেরেছি, যার জন্য এত রক্ত ঝরেছিল? গণতন্ত্রের চর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার—এসব কি যথার্থভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে?
স্বাধীনতার চেতনাকে জীবন্ত রাখতে হলে আমাদের ফিরতে হবে সেই মূল আদর্শে—অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা এবং সাম্যের দর্শনে। দুর্নীতি, বৈষম্য ও সংকীর্ণ স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে সম্মিলিত প্রতিরোধ। নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস এমনভাবে সঞ্চারিত করতে হবে, যেন তারা কেবল এই ইতিহাস জানে না—বরং তা অনুভব করে, ধারণ করে এবং তা থেকে শক্তি আহরণ করে।
আজকের এই পবিত্র দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক আরও দৃঢ়, আরও সুস্পষ্ট—আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ব, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, যেখানে ন্যায়বিচার হবে অটল, যেখানে মানবিকতা হবে সর্বোচ্চ মূল্যবোধ, আর যেখানে স্বাধীনতার চেতনা কখনোই ম্লান হবে না। রক্তঋণের এই ভার মাথায় নিয়েই আমরা এগিয়ে চলব—একটি আলোকোজ্জ্বল, সমৃদ্ধ, শান্তিময় ভবিষ্যতের দিকে। জয় বাংলা—জয় হোক মানুষের, জয় হোক মানবতার।
লেখক: কবি ও শিক্ষার্থী