শিমুল চৌধুরী ধ্রুব: রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নতুন সংযোজন প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার এখন গ্রাহকদের জন্য নতুন ধরনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিল পরিশোধ সহজ করা, বিদ্যুতের অপচয় কমানো এবং বকেয়া বিল নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে চালু করা এই ব্যবস্থা বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে উল্টো চাপ ও অসন্তোষ তৈরি করছে।
কয়েক বছর আগে ধাপে ধাপে পুরনো পোস্টপেইড ও ডিজিটাল মিটার সরিয়ে বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়। কিন্তু এখন অনেক গ্রাহক বলছেন, প্রত্যাশিত সুবিধা না পেয়ে বরং তারা নতুন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রযুক্তিগত জটিলতা, রিচার্জে বিঘ্ন, মিটার লক হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে।
রাজধানীর ডেমরা থানার সারুলিয়া এলাকার বাসিন্দা রাশেদ মাহমুদ বলেন, “আগে আমাদের বাসায় মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে বিদ্যুৎ বিল আসত। কিন্তু প্রিপেইড মিটার বসানোর পর একই ব্যবহারেও এখন প্রায় ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচ হচ্ছে। রিচার্জ করার সঙ্গে সঙ্গেই দেখি বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে—মিটার ভাড়া, ভ্যাট, সার্ভিস চার্জ, আবার ডিমান্ড চার্জও। আমরা তো সংযোগ নেওয়ার সময়ই ডিমান্ড চার্জ দিয়েছি। তাহলে প্রতি রিচার্জে আবার কেন কাটা হবে? বিষয়টা কেউ পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না। এতে আমাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করে, কারণ খরচ বাড়ছে কিন্তু এর সঠিক হিসাব বোঝা যাচ্ছে না।”
যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকার গৃহিণী সাবিনা ইয়াসমিন জানান, “মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে মিটার লক হয়ে যায়। তখন বাসায় ছোট বাচ্চা থাকলে খুব বিপদে পড়তে হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে পানির মোটর চলে না, রান্না করা যায় না, বাচ্চাদের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায়। মিটার আনলক করতে বিদ্যুৎ অফিসে ফোন দিতে হয়, কখনো যেতে হয় সরাসরি। অনেক সময় তারা বলে সার্ভার সমস্যা, অপেক্ষা করতে হবে। এই অপেক্ষা কখনো এক-দুই ঘণ্টা, কখনো আরও বেশি সময় হয়ে যায়। এই ধরনের পরিস্থিতি খুবই কষ্টকর।”
শ্যামপুরের ধোলাইপাড় এলাকার বাসিন্দা মো. তানভীর হোসেন বলেন জরুরি ব্যালান্স নিয়ে, “মিটারে টাকা শেষ হয়ে গেলে জরুরি ব্যালান্স নেওয়ার একটা সুবিধা আছে। কিন্তু পরে যখন রিচার্জ করি, তখন সেই টাকা শুধু কাটা হয় না, সঙ্গে অতিরিক্ত চার্জও যোগ হয়। আমরা ভাবি এটা একটা সহায়তা, কিন্তু বাস্তবে এটা একটা বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় জরুরি ব্যালান্স নেওয়ার পর বুঝতেই পারি না পরবর্তীতে কত টাকা কাটা হবে। এতে বাজেট ঠিক রাখা কঠিন হয়ে যায়।”
মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, “আমরা নিজের টাকায় মিটার কিনে লাগিয়েছি। তারপরও প্রতি মাসে ৪০ টাকা করে মিটার ভাড়া দিতে হয়, সঙ্গে আবার সার্ভিস চার্জও কাটা হয়। এটা আমাদের কাছে অন্যায্য মনে হয়। যদি মিটার আমাদেরই কেনা হয়, তাহলে আবার ভাড়া কেন দিতে হবে? এই প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর আমরা পাই না।”
এছাড়া অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, তাদের মতামত না নিয়েই পুরনো মিটার খুলে প্রিপেইড মিটার বসানো হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এই পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।
আরও একটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে রিচার্জ প্রক্রিয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সার্ভার জটিলতার কারণে বিকাশ, নগদ বা ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে রিচার্জ করতে সমস্যা হয়। বিশেষ করে রাতের বেলা বা ছুটির দিনে এই সমস্যা বেশি দেখা যায় বলে জানিয়েছেন গ্রাহকরা। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, ভুল করে তিনবার ভুল কোড দিলে মিটার লক হয়ে যায়, যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বড় ঝামেলার কারণ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় মিটারের সফটওয়্যার আপডেট না থাকা, নেটওয়ার্ক সিঙ্ক সমস্যার কারণে এই ধরনের ত্রুটি দেখা দেয়। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে মিটারের ক্যালিব্রেশন বা ডেটা সিঙ্ক না হওয়ায় ব্যবহার অনুযায়ী খরচের হিসাবও অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মিটার স্থাপন ও চার্জ আদায় করা হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থায় গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ে এবং বকেয়া বিলের ঝুঁকি কমে। তবে কোথাও প্রযুক্তিগত সমস্যা থাকলে তা সমাধানের জন্য গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল দক্ষতা বৃদ্ধি ও অপচয় কমানো। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্রাহক সচেতনতা, স্বচ্ছ বিলিং ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে এই উদ্যোগ সফল হবে না। তারা বলেন, প্রতিটি চার্জের বিস্তারিত ব্যাখ্যা, সহজ রিচার্জ ব্যবস্থা এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করতে না পারলে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ আরও বাড়বে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। অন্যথায় এটি সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে জনভোগান্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব