ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: আফ্রিকার তিন দেশ ঘানা, কোত দিভোয়ার ও ইথিওপিয়া সফরের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব জোরদার করার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে নয়াদিল্লি।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের পাঁচ দিনের আফ্রিকা সফর শেষ হয়েছে ১০ অক্টোবর। ৬ অক্টোবর ঘানা দিয়ে শুরু হওয়া এ সফরে তিনি কোত দিভোয়ার ও ইথিওপিয়া সফর করেন। সফরে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, উন্নয়ন সহযোগিতা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমইএ) তথ্য অনুযায়ী, সফরের অংশ হিসেবে জয়শঙ্কর ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কর্মরত ভারতের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সম্মেলনেও সভাপতিত্ব করেন।
সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন আফ্রিকার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি।
গত ৯ অক্টোবর আদ্দিস আবাবার আদওয়া বিজয় স্মৃতিসৌধ জাদুঘরে দেওয়া বক্তব্যে জয়শঙ্কর বলেন, আফ্রিকার চতুর্থ বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ভারত। দুই পক্ষের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ঘানা সফর করেন। ওই সফরে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘ব্যাপক অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে ইথিওপিয়া সফরকালে দুই দেশ ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ প্রতিষ্ঠা করে। পরে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ভারত সফর করেন।
এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে- দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ককে কীভাবে আরও গভীর বাণিজ্যিক সহযোগিতায় রূপ দেওয়া যায় এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই পক্ষের সমন্বয় কীভাবে কার্যকর করা সম্ভব? জয়শঙ্করের সফরে তিন দেশের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
ঘানা: দুটি সমঝোতা স্মারক সই
জয়শঙ্কর ৬ ও ৭ অক্টোবর ঘানা সফর করেন। এ সময় তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট জন দ্রামানি মাহামা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যামুয়েল ওকুদজেতো আবলাকওয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। ২০২৫ সালে মোদির সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক ব্যাপক অংশীদারত্বে উন্নীত হওয়ার পর এটিই ছিল সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ওষুধশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।
প্রথমটি কৃষি গবেষণা ও শিক্ষা বিষয়ে। এতে ভারতের কৃষি গবেষণা পরিষদ এবং ঘানার সিএসআইআর-ক্রপস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় সমঝোতা স্মারকটি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে। এতে ভারতের প্রাণিবৈচিত্র্য জরিপ সংস্থা এবং ঘানা বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হয়েছে।
ঘানার কৃষি খাতের ‘ফিড ঘানা’ কর্মসূচি, স্বাস্থ্য খাতের ‘আক্রা রিসেট’ উদ্যোগ এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের ‘ওয়ান মিলিয়ন কোডার্স’ কর্মসূচির সঙ্গে ভারতের সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলোর মিল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন জয়শঙ্কর। তার মতে, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে দুই দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে।
ঘানার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর জয়শঙ্কর বলেন, “গ্লোবাল সাউথ- এই পরিভাষাটি প্রচলিত হওয়ারও আগে থেকেই আমরা দু’জন এর পক্ষে সোচ্চার ছিলাম।”
‘গ্লোবাল সাউথ’ বলতে সাধারণত এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বোঝানো হয়। এসব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিনিধিত্ব এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলোই এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে।
ঘানা ও ভারত ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা, খনিজসম্পদ, প্রতিরক্ষা, রেলপথ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং শিল্পায়নকে সহযোগিতার অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ওষুধশিল্পে সহযোগিতার সম্ভাবনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঘানা নিজস্ব ওষুধ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে আগ্রহী। অন্যদিকে, তুলনামূলক সাশ্রয়ী ওষুধ উৎপাদনে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে এ খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কারিগরি সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সফরের আনুষ্ঠানিক ফলাফলে নতুন কোনও ওষুধ উৎপাদন চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
রেলপথ উন্নয়নও দুই দেশের সহযোগিতার আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এ ক্ষেত্রে ঘানার তেমা-মপাকাদান রেলপথ প্রকল্পের মতো উদ্যোগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
সফরে একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অগ্রগতির কথাও জানায় ঘানা। দেশটির মন্ত্রিসভা ব্রিকসে যোগ দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে এবং এ বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে।
জয়শঙ্কর ঘানার এই আগ্রহকে স্বাগত জানান। তবে তিনি বলেন, সদস্যপদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ব্রিকসের সব সদস্যের বিবেচনা প্রয়োজন। অর্থাৎ, ঘানার ঘোষণাটি সদস্যপদ পাওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; বরং সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ।
এছাড়া ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচার এবং সাংস্কৃতিক সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে ঘানার অবস্থানকে স্বাগত জানান জয়শঙ্কর। আন্তর্জাতিক বিগ ক্যাট অ্যালায়েন্সে (বড় আকারের বন্য বিড়ালজাতীয় প্রাণী সংরক্ষণ জোট) যোগ দিতে ঘানা তার গ্রহণপত্র জমা দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের সহযোগিতা বন্য প্রাণী সংরক্ষণেও বিস্তৃত হয়েছে।
তবে কৃষি গবেষণা ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন এবং প্রস্তাবিত খাতগুলোতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপরই নির্ভর করবে ব্যাপক অংশীদারত্বের সুফল কতটা পাওয়া যাবে।
কোত দিভোয়ার: বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও নিরাপত্তা সহযোগিতা
জয়শঙ্করের সফরের দ্বিতীয় গন্তব্য ছিল পশ্চিম আফ্রিকার দেশ কোত দিভোয়ার বা আইভরি কোস্ট। ৭ ও ৮ অক্টোবর তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট আলাসান ওয়াতারা, উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী তেনে বিরাহিমা ওয়াতারা এবং পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নিয়ালে কাবার সঙ্গে বৈঠক করেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫০ কোটি ডলারের বেশি। ভারত কোত দিভোয়ার থেকে কাজুবাদাম, প্রাকৃতিক রাবার, তুলা ও সেগুন কাঠ আমদানি করে। সফরে বিনিয়োগ, স্থানীয় উৎপাদন, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পণ্যের মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
কাঁচামাল রফতানির পরিবর্তে দেশে প্রক্রিয়াজাত করে বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারলে কোত দিভোয়ার অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে এবং কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, কৃষি, ওষুধশিল্প ও অবকাঠামো খাতে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। দেশটির প্রতিরক্ষা নেতৃত্বের সঙ্গে জয়শঙ্করের বৈঠকে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে যোগাযোগ এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার বিষয়গুলো উঠে আসে।
পশ্চিম আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কারণে এ ধরনের সহযোগিতার আঞ্চলিক গুরুত্ব রয়েছে। তবে সফরের প্রকাশিত ফলাফলে ভারত ও কোত দিভোয়ারের মধ্যে নতুন কোনও বড় প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সফরে জয়শঙ্কর ভারতের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচি- আইটিইসি (আইটেক) এর আওতায় প্রশিক্ষণ নেওয়া কোত দিভোয়ারের সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন। তিনি জানান, গত ১২ বছরে দেশটি আইটেক কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৮০০টি প্রশিক্ষণ-সুযোগ ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ১২৩টি এবং বেসামরিক খাতে ১০০টি প্রশিক্ষণ-সুযোগ বরাদ্দ ছিল।
এই যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে জয়শঙ্কর বলেন, “এই মানুষগুলোই আসলে একটি সম্পর্কের মূল পুঁজি।”
আইটেক কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাজীবীরা ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পান। জনপ্রশাসন, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষার মতো খাতে এই প্রশিক্ষণ তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করে। পাশাপাশি ভারতীয় কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগও গড়ে ওঠে।
তবে এ কর্মসূচির প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে কতটা প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কোত দিভোয়ারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে তার ওপর।
ইথিওপিয়া: বিনিয়োগে নতুন সমীকরণ
জয়শঙ্করের সফরের শেষ গন্তব্য ছিল ইথিওপিয়া। ৮ অক্টোবর আদ্দিস আবাবায় পৌঁছে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেদিওন তিমোথেওসের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, খনিজসম্পদ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল সরকারি অবকাঠামোর মতো বিষয় গুরুত্ব পায়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মোদির ইথিওপিয়া সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হয়েছিল। বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ভারত-ইথিওপিয়া সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কথা সামনে এসেছে।
ইথিওপিয়ার অর্থনীতিতে ভারতীয় বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আদওয়া বিজয় স্মৃতিসৌধ জাদুঘরে দেওয়া বক্তব্যে জয়শঙ্কর বলেন, গত দুই দশকে ইথিওপিয়ায় ৬০০টিরও বেশি ভারতীয় কোম্পানি বিনিয়োগ নিবন্ধন করেছে। তার হিসাব অনুযায়ী, এসব বিনিয়োগের ফলে ৭৫ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
ইথিওপিয়ায় উৎপাদনশিল্প, বস্ত্র, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভারতীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে।
প্রযুক্তি সহযোগিতার মধ্যে ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ডেটা সেন্টার প্রকল্প বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া ইথিওপিয়ায় আরও একটি ‘জয়পুর কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন শিবির’ আয়োজনের ঘোষণা দেন জয়শঙ্কর। ২০২৪ সালে দেশটির আফার অঞ্চলে আয়োজিত এ ধরনের একটি শিবিরে প্রায় ৪৫০ জনকে কৃত্রিম অঙ্গ দেওয়া হয়েছিল।
ভারত ইথিওপিয়ার কর্মকর্তাদের ফরেনসিক বিজ্ঞান, নারী ও শিশুবিষয়ক উন্নয়ন এবং গণমাধ্যম পরিচালনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে।
ঔপনিবেশিকতাবিরোধী ইতিহাস থেকে জাতিসংঘ সংস্কারের দাবি
ইথিওপিয়া সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক আয়োজন ছিল আদওয়া বিজয় স্মৃতিসৌধ জাদুঘরে জয়শঙ্করের বক্তব্য। ১৮৯৬ সালে আদওয়ার যুদ্ধে ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ইথিওপিয়ার বিজয় ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি ঐতিহাসিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। জয়শঙ্কর ওই ইতিহাসের সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নের যোগসূত্র তুলে ধরেন।
ভারতের আফ্রিকা নীতির অন্যতম ঘোষিত নীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “ভবিষ্যতের অংশীদারত্বের লক্ষ্য হওয়া উচিত সক্ষমতা তৈরি করা, নির্ভরশীলতা বাড়ানো নয়।”
জয়শঙ্কর ভারতের ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ লক্ষ্য এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের ‘এজেন্ডা ২০৬৩’-এর মধ্যে সাদৃশ্য তুলে ধরেন। ভারতের বিকশিত ভারত পরিকল্পনায় ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, এজেন্ডা ২০৬৩ আফ্রিকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও রূপান্তরের একটি মহাদেশীয় কর্মপরিকল্পনা।
জয়শঙ্করের বক্তব্যে শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে দুই পক্ষের সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, সম্পর্ককে কাঁচামাল রফতানির গণ্ডি থেকে বের করে মূল্য সংযোজনের দিকে এবং শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে প্রযুক্তি উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বিষয়টিও তুলে ধরেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার বক্তব্য, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী- উভয় ধরনের সদস্যপদে আফ্রিকার ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আফ্রিকার সাধারণ অবস্থান হিসেবে পরিচিত ‘এজুলউইনি ঐকমত্য’ ও ‘সির্তে ঘোষণার’ সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থানের অংশ। ২০২৩ সালে ভারতের জি২০ সভাপতিত্বের সময় আফ্রিকান ইউনিয়নকে জি২০-এর স্থায়ী সদস্য করা হয়েছিল। সে সময়ও আফ্রিকার আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।
আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দফতর আদ্দিস আবাবায় অবস্থিত। সেখানে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কর্মরত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের আঞ্চলিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার মধ্য দিয়ে জয়শঙ্কর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি মহাদেশজুড়ে ভারতের কূটনৈতিক কার্যক্রম সমন্বয়ের সুযোগও পেয়েছেন।
ভারতের আফ্রিকা নীতি:
ঘানা, কোত দিভোয়ার ও ইথিওপিয়া সফরে ভারতের আফ্রিকা-সম্পৃক্ততার তিনটি পৃথক দিক স্পষ্ট হয়েছে। ঘানার ক্ষেত্রে কৃষি গবেষণা ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে নতুন সমঝোতা ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছে। কোত দিভোয়ারের সঙ্গে আলোচনায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা গুরুত্ব পেয়েছে। আর ইথিওপিয়ার ক্ষেত্রে আগে থেকেই থাকা বিনিয়োগ সম্পর্ককে প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা দেখা গেছে।
নয়াদিল্লির লক্ষ্য, বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে এমন অংশীদারত্ব গড়ে তোলা, যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে ভারতের অগ্রাধিকারগুলো এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়িয়ে নিজেদের গ্লোবাল সাউথের অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে চায় ভারত।
তবে এই উদ্যোগের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আলোচনায় কোনও খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানেই সেখানে বিনিয়োগ হবে বা প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে- এমন নয়। যেমন- ব্রিকসে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ঘানার উদ্যোগ এখনও সদস্যদেশগুলোর সম্মিলিত বিবেচনার অপেক্ষায়। একইভাবে, সফরের আগে আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়া সত্ত্বেও প্রকাশিত ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদ নিয়ে নতুন কোনও চুক্তির ঘোষণা আসেনি।
তাই কূটনৈতিক সফরের ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তবায়নের অগ্রগতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সমঝোতা স্মারক থেকে কার্যকর প্রকল্প, বিনিয়োগ থেকে কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরির প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত সহযোগিতার প্রকৃত সুফল নির্ধারণ করবে।
জোরদারে প্রতিটি দেশের নিজস্ব চাহিদা ও জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব টেকসই করতে হলে উভয় পক্ষের স্বার্থের সমন্বয় এবং বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে হবে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের গুরুত্ব শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ ও পারস্পরিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরিও এ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক। এ ক্ষেত্রে ঘোষিত উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন এবং সহযোগিতার সুফল দুই পক্ষের কাছে পৌঁছানো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
জয়শঙ্করের সফরের মূল্যায়ন তাই তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ভিত্তিতেও করতে হবে। চুক্তি ও সমঝোতার বাস্তব অগ্রগতি, অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিস্তার এবং অভিন্ন স্বার্থে কার্যকর সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে এ সফর কতটা সফল হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভারত ও আফ্রিকার অংশীদার দেশগুলোর জন্য এ উদ্যোগের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হবে পারস্পরিক সহযোগিতা থেকে কতটা বাস্তব, কার্যকর ও মূল্যবান সুফল অর্জিত হয়।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ