কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: রাত যত বাড়ে, সাজিদের কান্না তত বাড়ে, বাড়ে তার অস্থিরতা। ছোট্ট আয়েশার অবস্থাও নাজুক। ছোট দুই ভাইবোনকে সামলাতে সামলাতে নিজেরাও যে ছোট তা মনেই থাকেনা তায়েবা আর তাবাসসুমের। এভাবেই নিজের মা-হারা সন্তানদের কথা বলেন ইমতিয়াজ সুলতান।
গত ৪ মার্চ ইফতারের আগ মুহুর্তে নিজ কার্যালয়ে নিজ বিভাগের সাবেক কর্মচারী ফজলু কর্তৃক গলায় ছুরিকাঘাতে হত্যার শিকার হন ইবির সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা। কিন্তু রুনা রেখে যান তার ফুলের মতো ফুটফুটে চারটি সন্তান।
বড় মেয়ের নাম তাইয়েবা। ১১ বছর বয়সী তাইয়েবা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ইমতিয়াজ-রুনা দম্পতির দ্বিতীয় সন্তানের নাম তাবাসসুম। ৯ বছর বয়সী তাবাসসুম দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। তৃতীয় সন্তান সাজিদ আবরারের বয়স মাত্র আড়াই বছর । এছাড়া তাদের সবচেয়ে ছোট বাচ্চা আয়েশার বয়স দেড় বছরেরও কম।
জানা যায়, সাজিদের যখনই মায়ের কথা মনে পড়ে, তার মা যেখানে ঘুমাচ্ছে সেখানে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে। ছোট্ট আয়েশা তো বোঝেই না যে তার মা আর দুনিয়াতে নেই। তবে মায়ের আদর-সোহাগের অভাবে ঠিকই শুকিয়ে গেছে। বাবা ইমতিয়াজ সুলতানকে অধিকাংশ সময়ই এই ছোট দুজনকে সময় দিতে হয়। বড় দুজন তা বুঝে। রাতে তারাও বাবার বুকে মাথা রেখে কাঁদে।
জানা যায়, রুনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকেল পর্যন্ত কাজ করার পর রাতে বাসায় এসেও খাতা দেখাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে বেশ কিছু সময় ব্যস্ত থাকতেন। ফলে ঈদের ছুটির সময়টা ছাড়া পরিবারকে ভালোভাবে সময় দেয়াটা হয়ে উঠেনা তার। কিন্তু এবারে ঈদেও নেই রুনা। চিরতরে আছেন পরোপারে।
রুনার পরিবারে এবার ঈদের আনন্দ নেই। বরং আছে শোকের ছায়া। বিচারের আকুতি। ঘাতক ফজলু ঘটনাস্থলেই ধরা পড়ে। কিন্তু সে তখন নিজের গলায়ও ছুড়ি চালিয়ে আত্মহননের চেষ্টা করে।
পরিবার জানায়, হাসপাতালে খোজ নিয়ে তারা জানতে পেরেছে যে ফজলু এখন যথেষ্ট সুস্থ। ফজলু নাকি কথাও বলতে পারে বলে জানান তারা। কিন্তু কেন তাকে এখনও তাকে জবাবদিহিতার আওতায় না এনে হাসপাতালে ভিআইপিভাবে রাখা হচ্ছে এ প্রশ্নের উত্তর পাননি রুনার পরিবার।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হাসান ইমাম জানান, ফজলুকে প্রায় একসপ্তাহেরও বেশি সময় আগে এ হাসপাতাল থেকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে। সেখানে তার একটি সার্জারীর প্রয়োজন। কিন্তু সম্ভবত পরিবার ও পুলিশ প্রশাসনের গড়িমসির কারণেই তাকে এখনও কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালেই রাখা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
মামলার বাকি আসামিদেরও এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তদন্তকারী সংস্থাগুলো। সবমিলিয়ে রুনা হত্যার সুষ্ঠু বিচারের জন্য প্রশাসন কতটা সচেষ্ট তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে রুনার পরিবারের সদস্যদের। তবুও সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে অপেক্ষায় আছে রুনার পরিবার।
উল্লেখ্য, গত ৪ মার্চ আনুমানিক বিকাল ৪টার দিকে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে আসমা সাদিয়া রুনার নিজ অফিস কক্ষে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। পরে ওই কক্ষেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকেও আত্মহননের চেষ্টা অবস্থায় দেখেছেন বলে জানান চিৎকার শুনে উদ্ধার করতে যাওয়া আনসার সদস্য ও কয়েকজন শিক্ষার্থী। পরে খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয়ের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসাপাতালে পাঠালে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিক্ষিকাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরে তার স্বামী ফজলুকে প্রধান আসামিসহ আরও তিনজনকে (দুইজন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তা) আসামি অর্থাৎ মোট চারজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ অপর তিন আসামিকে ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে৷ এছাড়াও তাদের দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে তারা। এদিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ফজলুকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম