| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

সরাসরি শুনবেন মেয়ের মুখে বাবা ডাক, যাত্রাপথের ভোগান্তি যেন কিছুই না...

reporter
  • আপডেট টাইম: মার্চ ১৭, ২০২৬ ইং | ০৫:১৯:০০:পূর্বাহ্ন  |  ৪৬৯৩৫৭ বার পঠিত
সরাসরি শুনবেন মেয়ের মুখে বাবা ডাক, যাত্রাপথের ভোগান্তি যেন কিছুই না...

স্টাফ রিপোর্টার:গত মাসে সরকারি একটি দপ্তরে চাকরি নিশ্চিত হওয়া আকাশের জন্য এবার ঈদ মানে শুধুই আনন্দ নয়, বরং দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের আনন্দ। নানা কারণে গত ১৪ মাস ধরে বাড়ি ফিরতে পারেননি তিনি। এই সময় একমাত্র কন্যা, মা ও স্ত্রীর সঙ্গে শুধু ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন।

ঈদের আগের মুহূর্তে সরাসরি মেয়ের মুখে ‘বাবা’ ডাক শুনবেন—এই উপলক্ষেই আকাশের চোখে ছলছল আনন্দ। কমলাপুর রেলস্টেশনে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, মেয়ের বয়স মাত্র তিন বছর। ফোনে শুধু ‘বাবা’ বলে ডাকতো, এবার সরাসরি শুনব। ভাবতেই শিহরিত হচ্ছি। স্ত্রী ও মা অপেক্ষায়।

এই দীর্ঘ সময়ের ক্লান্তি, যাত্রাপথের কষ্ট সব যেন অবলীলায় নেমে গেছে আকাশের মনে। স্ত্রী ও মায়ের হাতে নতুন কাপড় তুলে দিতে পারার আনন্দও তার অনুভূতিকে দ্বিগুণ করেছে। আকাশ চিলাহাটি এক্সপ্রেসে যাত্রা করবেন ডোমারগামী।

কাল থেকে ছুটি সবুজের হানিফ পরিবহনের যাত্রী সবুজ কয়েকজন বন্ধু মিলে এক সঙ্গে বাড়ি ফিরছেন। তার বাড়ি ফেরাটা ভিন্নরকম অনুভূতির। অনেক অনেক কেনাকাটা করেছি। এখন শুধু ফেরার পালা। রাত সাড়ে ১০ টায় ঢাকা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় আকাশের বাস।

আজ ২৬ রমজান। ২৯ রমজানে চাঁদ উঠলে ২০ তারিখ ঈদ। নয়ত ঈদ ২১ মার্চ। এমন সমীকরণে ঘরমুখো মানুষের যেন সব বেড়িয়ে পড়েছেন নাড়ির টানে। যাত্রীর জনস্রোতের গন্তব্য যেন আজ সব বাস লঞ্চ ও রেল স্টেশন গুলোতে।

সোমবার (১৬ মার্চ) রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরে গিয়ে দেখা যায় যাত্রীতে ঠাসা বাস টার্মিনাল, প্রতিটি কাউন্টারে যাত্রীর চাপ। যাত্রী ছাউনি ছাপিয়ে চায়ের দোকান, ফুটপাত, ফাঁকা সব জায়গায় লাগেজ, ব্যাগ নিয়ে সিডিউল বাসের অপেক্ষায় যাত্রীরা। সিডিউল মেনে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে সব বাস।

কাউন্টারে বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের অনেকে ভিডিও কলে অথবা ফোনে কথা বলে স্বজনদের জানান দিচ্ছেন একটু পরেই ছেড়ে যাবে বাস। সকালেই হচ্ছে কাঙ্খিত সেই সাক্ষাৎ, দেখা।

ন্যাশনাল ট্রাভেলসের কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ডের কাউন্টার মাস্টার মেনাজ বলেন, দুদিন আগে থেকে ঈদযাত্রার বাস ছেড়েছি। তবে আজ সবচেয়ে বেশি চাপ কাউন্টারে। কারণ কাল থেকে সরকারি সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ।

তিনি বলেন, ২৭/২৮ টা বাস ছেড়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। আজ কোনো বাসের সিট খালি নেই। সড়কে যানজট নেই, যান চলাচল স্বাভাবিক। সিডিউল বিপর্যয় না থাকায় যাত্রীরাও স্বস্তি প্রকাশ করছেন।

নাবিল পরিবহনের সৈয়দপুরের যাত্রী সোহেল বলেন, প্রতি ঈদেই সড়কে যানজট লাগে। কাউন্টারে পৌঁছাতেই বাড়তি সময় লেগে যায়। কখনো কখনো সিডিউল বিপর্যয় তো ভোগান্তিতে ফেলে। আজ আগেই কাউন্টারে পৌছে গেছে। কাউন্টারে বসার অবস্থা নেই। প্রচুর যাত্রী। কিন্তু স্বস্তিবোধ করছি কারণ কোনো বাস দেরি করছে না। সব বাস সময় মতো ছেড়ে যাচ্ছে।

নাবিল পরিবহনের মাস্টার নুরুন্নবী বলেন, কোনো সমস্যা নেই। সড়কে যানজট নেই। যানচলাচল স্বাভাবিক। তবে ঢাকার ভেতরেই একটু ঝামেলা।

দেশ ট্রাভেলসের যাত্রী অর্নব বাশার বলেন, দুদিন আগে সেমিস্টার পরীক্ষা শেষ করেছি। কাল কেনাকাটা আজ ব্যাগ গুছিয়ে সোজা কাউন্টারে। গন্তব্য গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। বাবা-মা অপেক্ষায়। ছোট ভাইটা ক্ষণে ক্ষণে ফোন দিচ্ছে। ভীষণ অস্থির লাগছে, কতক্ষণে ফিরব বাড়ি!

দেশ ট্রাভেলস্ এর ম্যানেজার(ঢাকা) এবং গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিবহন কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি মো. জানে আলম রাজন বলেন, যাত্রীর বাড়তি চাপ আজ। যাত্রীদের জন্য চা, পানির ফ্রি ব্যবস্থা রেখেছি। বাস যেন সময় মতো গন্তব্যে ছেড়ে যায় সেজন্য যথাসাধ্য সব করেছি। সিডিউল বিপর্যয়ের শঙ্কা এখনো নেই। তবুও কিছু বাস ফ্রি রেখেছি। যাতে যাত্রীরা স্বস্তিতে যান ভোগান্তিতে না পড়েন। দিনশেষে যাত্রী সেবাই আমাদের ব্রত। 

এদিকে সন্ধ্যায় রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর বাস স্ট্যান্ড এলাকাতেও ঘরমুখো মানুষের ঢল দেখা যায়। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ আশপাশের সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বাস সংকটের সুযোগে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা এবং অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এয়ারপোর্ট, আজমপুর, হাউজ বিল্ডিং ও আব্দুল্লাহপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে শত শত যাত্রী বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত মহাসড়কে ধীরগতিতে যান চলাচলের কারণে দীর্ঘ যানজটে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।

যাত্রীদের অভিযোগ, আন্তঃজেলা ও অন্তঃজেলার অনেক বাস বাড়তি আয়ের আশায় নির্ধারিত রুট ছেড়ে একাধিক ট্রিপ দিচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট রুটে বাসের সংকট দেখা দিয়েছে এবং সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন— ঢাকা থেকে রংপুরগামী এই রুটে সাধারণ সময়ে যেখানে বাসভাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, সেখানে বর্তমানে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। বাস না পেয়ে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে ট্রাকসহ বিভিন্ন বিকল্প পরিবহনে যাতায়াত করছেন। এসব ট্রাকেও জনপ্রতি ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে সড়কপথের পাশাপাশি ট্রেন যাত্রাতেও ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। অনেক যাত্রী টিকিট কেটে আসন না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ফেসবুকের ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে হেল্পলাইন’ গ্রুপে একটি কোচ বোঝাই মানুষের ছবি দিয়ে তানভীর আহমেদ রওনক লিখেছেন, 'এমন অবস্থা হয়েছে—মানুষ তার সিট পর্যন্ত যেতে পারছে না।'

একই গ্রুপে আরএস সাগর আহমেদ জয়দেবপুর জংশন থেকে একটি পোস্ট করে লিখেছেন, 'আংশিক ভিড় নিয়ে খুলনাগামী চিত্রা এক্সপ্রেস জয়দেবপুর জংশন ছেড়ে গেছে।' পোস্টের ছবিতে কোচের ছাদেও যাত্রীদের বসে থাকতে দেখা যায়।

'ময়মনসিংহ ট্রেন কমিউনিটি' গ্রুপে এমডি তুহিন সারোয়ার একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, 'মাননীয় রেলমন্ত্রী, টিকিটধারী ব্যক্তিরাই ট্রেনে উঠতে পারছে না। আপনার রেল প্রশাসনের বেহাল অবস্থা। ট্রেনের ভেতরে বসা তো দূরের কথা, দাঁড়ানোর জায়গাও নেই।'

এমন পরিস্থিতির আগেই সোমবার সকালে রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে যান সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। পরিদর্শন শেষে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বাস মালিকদের পক্ষে সাফাই গেয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তারা তাদের খুশিতেই কম নিচ্ছে। যত কম রাখা যায় নির্ধারিত ভাড়া চেয়ে। যদি ৭০০ টাকা সরকারি ভাড়া হয়, তবে যাত্রী আকৃষ্ট করতে আগে ১০০ টাকা কমিয়ে তারা ৬০০ টাকা নিতেন। এখনও তাই নিচ্ছেন। আবার কেউ ২০ টাকা কমিয়ে ৬৮০ টাকা নিচ্ছেন। অর্থাৎ নির্ধারিত ভাড়া অতিক্রম করেছে— এমন কোনো নজির আমি গত সাত দিনে পাইনি। আমি নিশ্চিত এটা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নয়। হয়তো আগে নেওয়া ভাড়ার চেয়ে ১০০ টাকা বেশি।

রেলপথ ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, আজকে সরকারি ছুটি অফিস করেই হবে। সেই কারণে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে চাপ বাড়তে পারে। সেই বাড়তি চাপ কিভাবে মোকাবিলা করা যায়, যাত্রীদের বাড়তি চাহিদা কিভাবে বাস মালিকরা পূরণ করবেন— সে ধরনের প্রস্তুতিও আমরা দেখেছি। এখানে যথেষ্ট সংখ্যক বাস রয়েছে। আমি মনে করছি, এবার আমাদের জনগণ বাস স্টপেজ, ট্রেন স্টেশন বা লঞ্চ স্টেশন থেকে একটি স্বস্তির ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিতভাবে পেতে চলেছে।

এর আগে গত ১৩ মার্চ ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শনে এসে রেলপথমন্ত্রী বলেন, আমরা মনে করছি মানুষের স্বস্তির মাধ্যমে যাত্রাটা নিশ্চিত হবে। ট্রেনে প্রায় ১২৪টি কোচ মিটারগেজে যুক্ত করেছি। আরও প্রায় ১৪টি ব্রডগেজ কোচ যুক্ত করা হয়েছে। আমাদের যে সক্ষমতা আছে, তাতে ৩৬ থেকে ৪২ হাজার মানুষকে এই সেবা দিতে পারব। শেষ মুহূর্তে কিছু চাপ হয়, অনেকে যেকোনো মূল্যে ট্রেনে উঠতে চান—আমরা তা নিবৃত করার চেষ্টা করছি। ওঠার সব ব্যবস্থা বন্ধ করছি।

রিপোর্টার্স২৪/বাবি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪