ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: ঠাকুরগাঁও শহরের বাসস্ট্যান্ড গোলচত্বরে প্রতিদিন ভোরে বসে দিনমজুরদের শ্রমের হাট। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকেরা এখানে আসেন কাজের আশায়। কৃষিকাজ, নির্মাণ, মাটি কাটা, রং-চুনকামসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত এসব শ্রমিকের কেউ কয়েক দিন, আবার কেউ কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ পাচ্ছেন না।
শুক্রবার সকালে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন অনেক শ্রমিক। কারও হাতে কর্নি-কোদাল, কারও হাতে বাঁশের ঝুড়ি-কাস্তে। কেউ আবার রং-চুনকামের সরঞ্জাম নিয়ে অপেক্ষা করছেন। সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেকে কাজ পাননি।
৬২ বছর বয়সী আব্বাস আলী গত দুই মাস ধরে এই হাটে আসছেন। তিনি বলেন, ‘দেখেন, গত দুই মাস ধরে আমি কোনো কাজ পাচ্ছি না। আজও যদি কাজ না পাই, তাহলে বাড়িতে আমার পরিবারকে না খেয়ে থাকতে হবে। আমাদের আর কোনো উপায় নেই। পরিস্থিতি খুবই খারাপ।’
শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের শিবরামপুর থেকে কাজের সন্ধানে আসেন নিপুন চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, ‘আমি দিনমজুরের কাজ করি। কিন্তু এখন কাজের মন্দা চলছে। এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই, তাই আমাদের খুব কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে। ঋণ করে আমাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে।’
শাহেদ হোসেনের বাবা ১৫ থেকে ২০ দিন আগে মারা গেছেন। এরপর তাঁর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়ে মাত্র ছয় দিন কাজ পেয়েছেন তিনি। তিন মেয়ের বাবা শাহেদ বলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করতে করতে আমি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে গেছি। আর আজও যদি খালি হাতে বাড়ি ফিরি, তাহলে আমার পরিবারের খাওয়ার মতো কিছুই থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার তিনটি মেয়ে। তাদের পড়াশোনার খরচও দিতে পারছি না। কাজ নেই, এখন কাজের মন্দা চলছে। আমি কী করব? গতকাল থেকে বাড়িতে ভাত খাইনি।’
সদর উপজেলার আদর্শ কলোনি বাঙালিপাড়া থেকে আসা মজনু মিয়া ১৮ দিন ধরে এই হাটে আসছেন। তাঁর দাবি, এ সময়ে এক দিনও কাজ পাননি। আট সদস্যের সংসার তাঁর।
মজনু বলেন, ‘আমরা পেটের দায়ে কাজ করার জন্য এই স্ট্যান্ডে আসি। কিন্তু কাজ পাই না। এক দিন কাজ হলে পরের দুই দিন কাজ থাকে না। বর্তমানে তো কাজই নেই। এভাবে আমার সংসার চলবে কীভাবে?’
চিকিৎসা ও সংসারের খরচ নিয়েও সমস্যার কথা জানান মজনু। তিনি বলেন, ‘ছেলে-সন্তানের অসুখ-বিসুখ হয়, কিন্তু চিকিৎসা করার মতো পয়সা-কড়ি নেই। ১৮ দিন ধরে ঘুরছি, কিন্তু একটা টাকাও আয় করতে পারিনি। বরং প্রতিদিন আসা-যাওয়ায় পকেট থেকে আরও ১০-২০ টাকা করে খরচ হয়ে যাচ্ছে।’
ভাদাই এলাকা থেকে আসা মোহাম্মদ আলী চার-পাঁচ দিন ধরে কাজ পাননি। বড় খোঁচা বাড়ি থেকে আসা ভবেশ চন্দ্রও প্রায় এক মাস ধরে কাজের সন্ধানে ঘুরছেন।
ভবেশ বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে, গেরস্তরা আসে না। আজ সকাল থেকে বসে আছি, এখন পর্যন্ত একটা গেরস্তও আসেনি। কে লোক নেবে, কে খাটাবে? বউ-বাচ্চা নিয়ে কী খাব? সংসারের বাজারখরচই তো এখন চালাতে পারছি না।’
স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধান কাটার ও ধান রোপণের মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে কৃষিকাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় দিনমজুরদের একটি অংশ বিকল্প কাজের জন্য এই হাটে আসছেন। তবে বর্তমানে শ্রমিকের চাহিদা কম থাকায় অনেকে কাজ পাচ্ছেন না।
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, ‘এটা আসলে একটা ক্রাইসিস। এখন মনে হচ্ছে কাজ নেই। ধান তো এখন মাঝপথে আছে। এই মুহূর্তে ধান কাটারও মৌসুম নয়, আবার লাগানোরও মৌসুম নয়। মাঝখানের এই সময়টাতে তাঁরা একটা সংকটে পড়েছেন। আপনারা বিষয়টি আমার নজরে এনেছেন, এজন্য ধন্যবাদ। আমি বিষয়টি নিয়ে কালকে একটু চিন্তা করে দেখি, কিছু করা যায় কি না।’
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব