ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কি এবার কাটতে শুরু করেছে? সাম্প্রতিক কয়েকটি কূটনৈতিক তৎপরতা অন্তত তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে ২৯ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপপ্রধানমন্ত্রী শেখ মনসুর বিন জায়েদের রিয়াদ সফর এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তার বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে রিয়াদ সফর করেন শেখ মনসুর। বৈঠকে সৌদি যুবরাজের পাশাপাশি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানসহ দুই দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় সৌদি-আমিরাত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’ বৈঠকটিকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদারত্বের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে বিষয়টি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন গত কয়েক বছরে ইয়েমেনসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে রিয়াদ ও আবুধাবির নীতিগত পার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।
একসময় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন যুদ্ধে একই জোটের অংশীদার ছিল। ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের অংশ হিসেবে দুই দেশই ইয়েমেনের তৎকালীন সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইয়েমেন নিয়ে দুই দেশের কৌশলে পার্থক্য তৈরি হয়। সৌদি আরব ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় সরকারকে সমর্থন করলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ বা এসটিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে।
এই ভিন্ন অবস্থান শেষ পর্যন্ত দুই মিত্রের মধ্যে দূরত্ব বাড়ায়। ২০২৫ সালে সৌদি সীমান্তের কাছে আমিরাত-সমর্থিত একটি ইয়েমেনি গোষ্ঠীর অগ্রযাত্রার পর সম্পর্কের সংকট আরও প্রকট হয় এবং সৌদি আরব একটি আমিরাত-সংযুক্ত অস্ত্র চালানের ওপর হামলা চালানোর পর আবুধাবি ইয়েমেন থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগও নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি বাহিনীর সংঘাত আবার তীব্র হয়েছে। হুথিদের হামলা সৌদি ভূখণ্ড, অবকাঠামো ও আঞ্চলিক বাণিজ্যপথের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে রিয়াদ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতাও জোরদার করছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর তিন দেশের সামরিক কর্মকর্তারা রিয়াদে বৈঠক করে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও সম্প্রতি উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাকে ‘অবিচ্ছেদ্য’ হিসেবে উল্লেখ করে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নিরাপত্তার ওপর কোনো হুমকি এলে কঠোরভাবে মোকাবিলার কথাও বলেছেন।
শেখ মনসুর বিন জায়েদের রিয়াদ সফরকে সরাসরি সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের পূর্ণ পুনর্মিলন হিসেবে ঘোষণা করার মতো তথ্য এখনো নেই। দুই দেশের সরকারি বক্তব্যে মূলত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ার বিষয়টি স্পষ্ট। জুলাইয়ে দুই দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌদি-আমিরাত সম্পর্ককে অভিন্ন ইতিহাস ও ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধনের সম্পর্ক হিসেবে তুলে ধরেন। আগস্টে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ সৌদি বাদশাহ সালমানকে আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের পানি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।
অর্থাৎ, সম্পর্কের বরফ গলানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যে চলছে, তার কিছু প্রকাশ্য ইঙ্গিত রয়েছে।
আরেকটি বিষয়ও এই কূটনৈতিক তৎপরতাকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে। ২৭ সেপ্টেম্বর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবুধাবিতে গিয়ে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই পক্ষের আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও তা আরও জোরদারের বিষয় উঠে আসে।
এর পরদিনই শেখ মনসুর বিন জায়েদের সৌদি সফর ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন কিছু প্রতিবেদনে সৌদি প্রতিনিধিদের আবুধাবির বৈঠকে উপস্থিত থাকার দাবি করা হলেও সৌদি আরব তা অস্বীকার করেছে। সৌদি সূত্র জানিয়েছে, ওই বৈঠকে সৌদি কোনো প্রতিনিধি অংশ নেননি। ফলে ইসরাইল-আমিরাত বৈঠক এবং সৌদি-আমিরাত বৈঠকের মধ্যে সরাসরি কোনো সমন্বয় ছিল এমন দাবি নিশ্চিতভাবে করার সুযোগ নেই।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত শুধু নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার নয়; উপসাগরীয় অর্থনীতিতেও দুই দেশের প্রভাব ব্যাপক। তেলনীতি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে জড়িত।
একসময় ইয়েমেন, সুদান, ইরান, তুরস্ক এবং ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে নীতিগত পার্থক্য দেখা গেলেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন তাদের আবারও অভিন্ন স্বার্থের জায়গায় নিয়ে আসতে পারে।
বিশেষ করে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ দুই দেশের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে এমন বিশ্লেষণ সামনে আসছে।
১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসির মূল লক্ষ্যগুলোর অন্যতম ছিল উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য সেই ঐক্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরব আবারও উপসাগরীয় নিরাপত্তার সমন্বিত কাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছে। মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তাকে পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই বাস্তবতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি রিয়াদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে আবুধাবির জন্যও সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বয় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এটিকে এখনই পুরোনো সব দ্বন্দ্বের অবসান বা পূর্ণাঙ্গ মিত্রতায় প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সাম্প্রতিক সফর ও কূটনৈতিক যোগাযোগকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইয়েমেন সংকট, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং উপসাগরীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ—এসব ইস্যুতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আগামী দিনে কতটা সমন্বিত অবস্থান নেয়, সেটিই বলে দেবে তাদের সম্পর্ক সত্যিই নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে কি না।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম