কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পদ্মা নদীর পানি বাড়তে থাকায় সীমান্তবর্তী এলাকা রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় দুই ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে নদীভাঙন ও সাপ আতঙ্কে দিন কাটছে এসব এলাকার মানুষের।পরিস্থিতি বিবেচনায় রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাঠদান নিরুৎসাহিত করেছে উপজেলা প্রশাসন।
এ দুই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন, দুটি ইউনিয়নের ৩৫টি গ্রামে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৩৫ হাজার ও চিলমারী ইউনিয়নের ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী আছেন। ইউনিয়ন দুটির অধিকাংশ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজনে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও পদ্মার পানি বৃদ্ধির কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। পরে ধীরে ধীরে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়। এতে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও নিচু এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা পানিতে তলিয়ে গেছে।পদ্মার পানি বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে নদী তীরবর্তী এলাকাতেও। চিলমারী ইউনিয়নের পদ্মা নদীর তীরবর্তী সীমান্তঘেঁষা উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচর এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও যোগাযোগের সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জানা যায়, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাবিত এলাকার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে সাপের আতঙ্ক। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ঝোপঝাড়, গর্ত ও নিচু জায়গা থেকে সাপ উঠে শুকনো ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে পারে বলে শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে শিশু ও গবাদিপশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পরিবারগুলো। রাতের বেলায় পানির মধ্যে চলাচল করতে গিয়ে সাপের কামড়ের আশঙ্কায় অনেকে ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান,পানি বৃদ্ধির কারনে ঘরবাড়ির চারপাশ ডুবে গেছে। এখন আবার সাপের ভয়। রাতে ঘর থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাচ্চাদের নিয়ে বেশি চিন্তায় আছি।তারা আরও বলেন, পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি খারাপ হবে। ঘরবাড়িতে পানি উঠলে মানুষ শুকনো জায়গায় উঠবে। তখন সাপের ভয়ও বাড়বে।
এদিকে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির বিষয়টি নদীর পানি পরিমাপের তথ্যেও উঠে এসেছে। ১০ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টার হিসাবে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ৮ সেন্টিমিটার বেড়ে ১২ দশমিক ৯৮ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। আগের দিন ৯ সেপ্টেম্বর পানি ছিল ১২ দশমিক ৯০ মিটার। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে পানি বেড়েছে ৮ সেন্টিমিটার। এই পানি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় দৌলতপুরের পদ্মাতীরবর্তী চর ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।পদ্মার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে তীব্র স্রোতের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। পাশের পাবনা রাজবাড়ী নৌপথে পদ্মার প্রবল স্রোতের কারণে ফেরি চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে।
জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা বলেন, ভারতে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বেড়ে গেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টা আরও একটু পানি বাড়বে। এরপর পানি কমতে পারে।
উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। পানি আরও বাড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, ইতোমধ্যে প্লাবিত এলাকার ৩০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন পুরো পরিস্থিতি নজরে রেখেছে। প্লাবিত এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্লাবিত দুই ইউনিয়নের ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাঠদান নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম