আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় সুয়েইদা প্রদেশে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত সহিংসতায় ১,৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় দুই লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে এই সহিংসতায় জড়িত বিভিন্ন পক্ষের কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
শুক্রবার প্রকাশিত ৮৫ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে সিরিয়া বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন জানায়, সুয়েইদা গভর্নরেটে সহিংসতায় অন্তত ১,৭০৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দ্রুজ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা বেশি, পাশাপাশি বেদুইন সম্প্রদায়ের সদস্য এবং অন্তত ২২৫ জন সরকারি বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সহিংসতায় প্রায় দুই লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, যাদের মধ্যে এখনো প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার মানুষ নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেননি। যুদ্ধবিরতির কয়েক মাস পরও মানবিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
এদিকে, সিরীয় সরকারের গঠিত পৃথক তদন্ত কমিটিও একই ঘটনায় ১,৭৬০ জন নিহত ও ২,১৮৮ জন আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে। তাদের মতে, সংঘাতে সরকারি বাহিনী, স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিল। এসব ঘটনায় জড়িত অনেককে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
জাতিসংঘের তদন্তে উঠে এসেছে, সংঘাতে জড়িত সব প্রধান পক্ষই গুরুতর লঙ্ঘনে জড়িত ছিল, যার অনেকগুলোই যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়েও পড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৪ থেকে ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে এই সহিংসতা সংঘটিত হয়। প্রথম ধাপে সরকারি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা দ্রুজ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে হত্যা, নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও লুটপাট চালায়।
দ্বিতীয় ধাপে দ্রুজ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বেদুইন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালায়। এতে হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে বেদুইনদের বড় অংশ নিজ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
তৃতীয় ধাপে হাজারো উপজাতীয় যোদ্ধা সুয়েইদায় প্রবেশ করে ব্যাপক লুটপাট, হত্যা এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ চালায়। এতে অন্তত ৩৫টি গ্রামের প্রায় সব বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাড়িতে অভিযান চালানো কিংবা জনসমক্ষে নারীদের, শিশুদের, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। পাশাপাশি নির্যাতন, অপহরণ, যৌন সহিংসতা, ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা এবং বেসামরিক সম্পদের পরিকল্পিত ধ্বংসের প্রমাণও পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
১৯ জুলাই যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘর্ষ কমে এলেও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও সহিংসতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি এখনও অস্থির রয়ে গেছে বলে সতর্ক করেছে তদন্ত কমিশন।
সংস্থাটি বলেছে, এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রদান এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন না হলে ভবিষ্যতে আবারও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি