আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে একাধিক স্থানে তীব্র গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। চলমান এই সংঘাতে এক সপ্তাহে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
শুক্রবার সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে গোলাগুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের হিসাবে, সংঘাত শুরুর পর আফগানিস্তানে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার এবং পাকিস্তানে প্রায় ৩ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষ। একই সময় মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে পুরো অঞ্চলেই উত্তেজনা বাড়ছে।
বিমান হামলা ও পাল্টা আক্রমণ
সংঘাতের মধ্যে পাকিস্তান আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বিভিন্ন স্থাপনা, যার মধ্যে রাজধানী কাবুলের উত্তরে অবস্থিত বাগরাম বিমানঘাঁটিও রয়েছে।
আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তালেবান বাহিনী ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের দুই ডজনের বেশি স্থানে পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে। এতে ১৪টি সীমান্ত চৌকি ধ্বংস এবং একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তাদের দাবি, রাতভর সংঘর্ষে সাতজন আফগান বেসামরিক নাগরিক এবং তিনজন তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, তারা স্থল ও আকাশপথে সামরিক অভিযান চালিয়ে আফগানিস্তানের কয়েকটি সীমান্ত পোস্ট ধ্বংস করেছে। পাকিস্তানি বাহিনী তালেবান নেতৃত্বের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত কান্দাহার এলাকাতেও হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।
রমজানে গোলাবর্ষণ, আতঙ্কে সীমান্তবাসী
সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সূর্যাস্তের পর থেকেই ভারী গোলাবর্ষণ শুরু হয়। এতে রমজান মাসে ইফতারের সময় পরিবারগুলো সরাসরি গোলাগুলির ঝুঁকিতে পড়ছে।
আফগানিস্তানের প্রধান সীমান্ত ক্রসিং শহর তোরখামের বাসিন্দা পাকিস্তানি শ্রমিক হাজি শাহ ইরান বলেন, গোলাবর্ষণের কারণে তিনি পরিবারসহ বাড়ি ছেড়ে বন্ধুদের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন।
তিনি বলেন, “সকালে আমরা ঘর থেকে বের হলেই গোলা বর্ষণ শুরু হয়। আমাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু সব জিনিসপত্র এখনো সেখানেই রয়ে গেছে।”
বিক্ষোভ ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা
পাকিস্তানের হামলার প্রতিবাদে কাবুলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার পাকিস্তানের হামলাকে দেশটির সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, আফগানিস্তান তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালাচ্ছে। তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পাকিস্তানের জঙ্গিবাদ তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সমস্যা।
যুদ্ধবিরতির জন্য বেশ কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনার উদ্যোগ নেই। পাকিস্তান সরকারের মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি বলেন, এ নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। কোনো সংলাপ বা আলোচনা হবে না। আফগানিস্তান থেকে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করতে হবে।
জাতিসংঘের আফগানিস্তান মিশনের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে আফগানিস্তানে অন্তত ৫৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১২৮ জন আহত হয়েছেন। তালেবান সরকার অবশ্য দাবি করেছে, নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ১১০ জন।
তবে পাকিস্তান এই দুই পরিসংখ্যানই প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা কেবল জঙ্গি ও তাদের অবকাঠামোকেই লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি