আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে দেশটির কাছে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছেন। যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মাথায় শুক্রবার দেওয়া এই বক্তব্যকে সংঘাতের বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা দ্রুত যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকেও আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না শুধু নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া।
তিনি আরও বলেন, আত্মসমর্পণের পর ইরানের জন্য একটি ‘যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য’ নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে এনে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করে তুলতে কাজ করবে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন যে, যুদ্ধ বন্ধে কিছু দেশ মধ্যস্থতার উদ্যোগ শুরু করেছে। যদিও তিনি ওই দেশগুলোর নাম প্রকাশ করেননি।
পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, কিছু দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা শুরু করেছে। আমরা অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির পক্ষে, তবে দেশের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো দ্বিধা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি এবং ইরানের নেতৃত্ব নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কথা বলা কূটনৈতিক সমাধানের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। এই মন্তব্যের পরপরই বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়; ইউরোপের শেয়ারবাজারে দরপতন ঘটে এবং ওয়াল স্ট্রিটও নিম্নমুখী হয়ে লেনদেন শুরু করে।
এর আগে বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধে নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতাআলী খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকা উচিত। তিনি বলেন, “আমাদের ইরানের সঙ্গে মিলে সেই ব্যক্তিকে বেছে নিতে হবে।
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের অবস্থান সর্বোচ্চ নেতার অধীনস্থ। খামেনির মৃত্যুর পর বর্তমানে একটি বিশেষ প্যানেল তার দায়িত্ব পালন করছে এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।
বৈরুতেও হামলা জোরদার
এদিকে যুদ্ধের বিস্তার ঘটিয়ে ইসরায়েল লেবাননের রাজধানী বৈরুতেও ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ বৈরুতের পুরো উপশহর এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পর শুক্রবার সেখানে বিমান হামলা শুরু করে দেশটির বাহিনী।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ২৬ দফা বিমান হামলা চালিয়েছে। ওই এলাকায় কয়েক লাখ মানুষের বসবাস, যাদের অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
বৈরুত থেকে পালিয়ে আসা ৪৩ বছর বয়সী বাসিন্দা জামাল সাইফেদ্দিন বলেন, আমরা কেউ গাড়িতে, কেউ রাস্তায়, কেউ সমুদ্রতীরে রাত কাটাচ্ছি। এমনকি কেউ একটা কম্বলও এনে দেয়নি।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত শিয়া সংগঠন হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করেই ইসরায়েল এই হামলা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে। খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এই সপ্তাহে সংগঠনটি ইসরায়েলের ওপর হামলা চালিয়েছিল।
পাল্টা হামলা ও হতাহতের সংখ্যা
ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা নতুন করে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। দেশটির দাবি, প্রায় ৫০টি যুদ্ধবিমান তেহরানে খামেনির ধ্বংসপ্রাপ্ত কমপ্লেক্সের নিচে থাকা একটি বাঙ্কারেও হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ইসরায়েলে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরবেও নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর থেকে ইরানে অন্তত ১ হাজার ২৩০ জন নিহত হয়েছেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় সেখানে ১২৩ জন নিহত ও ৬৮৩ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের হামলায় ইসরায়েলে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে।
এছাড়া যুদ্ধের প্রথম দিনে একটি ইরানি মেয়েদের স্কুলে হামলায় বহু শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন মার্কিন সামরিক তদন্তকারীরা। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি