রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: মানুষের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য বলে এতদিন মনে করা হতো ‘কাল্পনিক বা রূপক খেলা’ (প্রিটেন্ড প্লে)। তবে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের নিকটতম আত্মীয় বোনোবো শিম্পাঞ্জির মধ্যেও রয়েছে অদৃশ্য বস্তু কল্পনা করে তা নিয়ে ভাবার সক্ষমতা। বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এ গবেষণা ইতোমধ্যে বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে।
গবেষণার কেন্দ্রে ছিল ‘কাঞ্জি’ নামের এক বিশেষ প্রজাতির বোনোবো, যে ইংরেজি ভাষা বোঝার সক্ষমতার জন্য আগে থেকেই পরিচিত। গবেষকরা জানান, দুই বছর বয়সী মানব শিশুর মতোই কাঞ্জি একটি কাল্পনিক ‘চা-চক্রে’ অদৃশ্য জুস ও আঙুরের হিসাব রাখতে পেরেছে। যদিও সে নিজে থেকে খেলা শুরু করেনি, তবু এতে অংশগ্রহণের দক্ষতা প্রমাণ করে- বাস্তবে নেই এমন বস্তু কল্পনা করার মানসিক সামর্থ্য তার ছিল।
জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজিক্যাল অ্যান্ড ব্রেইন সায়েন্সেস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণার সহ-লেখক ক্রিস্টোফার ক্রুপেনিয়ে বলেন, ফলাফল আমাদের সত্যিই বিস্মিত করেছে। মানুষের বিকাশের একেবারে প্রাথমিক স্তরে যে বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তা আমাদের নিকটতম প্রাণী আত্মীয়দের মধ্যেও বিদ্যমান।
কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?
গবেষণার প্রথম ধাপে কাঞ্জিকে দুটি স্বচ্ছ বোতলের মধ্যে কোনটিতে জুস আছে তা শনাক্ত করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। টানা ১৮ বার সঠিক উত্তর দিয়ে সে পূর্ণ নম্বর অর্জন করে।
এরপর মূল পরীক্ষায় গবেষকরা দুটি খালি কাপে জুস ঢালার অভিনয় করেন এবং পরে একটি কাপ থেকে ‘অদৃশ্য’ জুস জগে ফিরিয়ে নেওয়ার ভান করেন। কাঞ্জিকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে ৬৮ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক কাপ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়- যা কাকতালীয় সম্ভাবনার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
দ্বিতীয় পরীক্ষায় আসল ও কাল্পনিক জুস একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। যদি কাঞ্জি কাল্পনিক জুসকে বাস্তব মনে করত, তবে সে উভয় কাপ সমান হারে বেছে নিত। কিন্তু ৭৭.৮ শতাংশ ক্ষেত্রে সে আসল জুসের কাপটি নির্বাচন করে, যা দেখায় সে বাস্তব ও কল্পনার পার্থক্য বুঝতে পারছিল।
পরীক্ষাটি আরও নিশ্চিত করতে গবেষকরা কাল্পনিক আঙুর ব্যবহার করে একই পদ্ধতিতে তৃতীয় ধাপ পরিচালনা করেন। সেখানেও কাঞ্জি প্রায় ৬৮.৯ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক অবস্থান শনাক্ত করে।
বিবর্তনের ইঙ্গিত
গবেষকরা মনে করছেন, এই সক্ষমতা মানুষের মধ্যে বিবর্তিত হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ বছর আগে- যখন মানুষ ও বোনোবোর পূর্বপুরুষদের পথ আলাদা হয়ে যায়। ফলে কল্পনাশক্তি হয়তো একান্ত মানবিক বৈশিষ্ট্য নয়; বরং এর শিকড় আরও প্রাচীন।
তবে গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পরীক্ষা চালানো হয়েছে মাত্র একটি বোনোবোর ওপর। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী পল হ্যারিস মনে করেন, এটিকে দুই বছর বয়সী শিশুর সমপর্যায়ের সক্ষমতা বলা অতিরঞ্জন হতে পারে, কারণ শিশুরা নিজেরা থেকেই নিয়মিত কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করে।
অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারার বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞানী লরা সিমোন লুইস একে “বৃহৎ বানরজাতীয় প্রাণীদের কল্পনাশক্তির প্রথম সুস্পষ্ট প্রমাণ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নতুন দিগন্তের সূচনা
গবেষক আমালিয়া বাস্তোস ও ক্রুপেনিয়ে আশা করছেন, ভবিষ্যতে অন্যান্য বৃহৎ বানরজাতীয় প্রাণীর মধ্যেও এ ধরনের গবেষণা চালানো হবে। আগের বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে কল্পনাশক্তি হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি বিস্তৃত।
এই আবিষ্কার মানুষের বিবর্তন ও জ্ঞানীয় বিকাশ সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে- আমাদের কল্পনাশক্তি কি সত্যিই একান্তই মানবিক, নাকি তা আমাদের প্রাণিজ আত্মীয়দের সঙ্গেও ভাগাভাগি করা এক প্রাচীন উত্তরাধিকার?
রিপোর্টার্স২৪/আরকে