আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার চেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। গ্রেপ্তারদের মধ্যে তিনজন প্রভাবশালী সংস্কারপন্থী রাজনীতিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম।
রোববার (৯ ফেব্রুয়ারি) এসব গ্রেপ্তার করা হয়। ইরানের বিচার বিভাগ জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হুমকির প্রেক্ষাপটে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে ‘ব্যাপক কর্মকাণ্ড সংগঠিত ও নেতৃত্ব’ দেওয়ার অভিযোগে তাঁদের আটক করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মিজান এ তথ্য জানায়।
গ্রেপ্তার হওয়া তিন সংস্কারপন্থী নেতা হলেন,ইরানের রিফর্ম ফ্রন্টের প্রধান আজার মানসুরি, সাবেক কূটনীতিক মহসেন আমিনজাদেহ এবং সাবেক সংসদ সদস্য ইব্রাহিম আসগরজাদেহ। চতুর্থ ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
বিচার বিভাগের বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযুক্তরা ‘রাস্তায় সক্রিয় সন্ত্রাসী শক্তিগুলোর কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন’।
ইরানের রিফর্ম ফ্রন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এতে বলা হয়, বিচারিক আদেশের ভিত্তিতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা সদস্যরা আজার মানসুরিকে তাঁর বাসার দরজা থেকেই গ্রেপ্তার করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রিফর্ম ফ্রন্টের উপ-চেয়ারম্যান মহসেন আরমিন ও সাধারণ সম্পাদক বাদরাল সাদাত মোফিদিকেও তলব করেছে আইআরজিসি।
জানুয়ারির বিক্ষোভ ও প্রাণহানি
জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে এই গ্রেপ্তারগুলো হলো। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে তেহরান থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে এসব অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিদেশি হস্তক্ষেপকে দায়ী করে। সরকার জানায়, ওই অস্থিরতায় ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি—রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে অধিকাংশ মানুষ নিহত হয়েছেন,এই দাবি ইরান সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৫৪ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে এবং আরও ১১ হাজার ২৮০টি মৃত্যুর ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। এ ছাড়া ওই সময় হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
‘গুরুতর অভিযোগের মুখে’ সংস্কারপন্থীরা
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তোহিদ আসাদি জানান, গ্রেপ্তার হওয়া রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর অভিযোগ’ আনা হয়েছে। তিনি বলেন,মহসেন আমিনজাদেহ ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির (১৯৯৭–২০০৫) মেয়াদে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী।ইব্রাহিম আসগরজাদেহ ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য এবং ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একজন ছাত্রনেতা।
আসাদি বলেন,এই ব্যক্তিরা আগেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কারাবরণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিও তাঁদের জন্য নতুন করে কারাবাসের পথ তৈরি করতে পারে।বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরপাকড়ের মাধ্যমে সরকার ভিন্নমতাবলম্বী ও সংস্কারপন্থীদের প্রতি কঠোর বার্তা দিতে চাইছে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন কর্মসূচির পরিচালক সিনা আজোদি বলেন,এরা রাজনৈতিক উদারীকরণের পক্ষে কথা বলছিলেন। কেউ কেউ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসানও চেয়েছেন। এই গ্রেপ্তারগুলো দেখাচ্ছে, সরকার এখন রাজনৈতিক ভিন্নমতের সব পথ বন্ধ করে কঠোর দমননীতি বেছে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত
এই দমন-পীড়নের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বিক্ষোভ শুরু হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভ দমনে শক্তি প্রয়োগ করলে ইরানের ওপর নতুন হামলার হুমকি দেন। গত জুনে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌবহর মোতায়েন করেন।
এর জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ‘আঞ্চলিক যুদ্ধের’ হুঁশিয়ারি দেন। পরে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে শুক্রবার ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, এই আলোচনা ‘একটি অগ্রগতি’ এবং তাঁর সরকার সংলাপ অব্যাহত রাখতে আগ্রহী। আগামী সপ্তাহে আলোচনার আরেক দফা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ-এর গবেষক ফিলিস বেনিস আল জাজিরাকে বলেন, সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারগুলো চলমান পারমাণবিক আলোচনায় বড় প্রভাব ফেলবে বলে তিনি মনে করেন না। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এই গ্রেপ্তার এমন এক সময়ে হলো, যখন ওমানে আলোচনা চলছে এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বেনিস বলেন, নেতানিয়াহু সম্ভবত ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বাতিল এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা বন্ধের দাবি তুলবেন।এটি কার্যত ইরানের আত্মসমর্পণের আহ্বান,বলেন তিনি। আল জাজিরা
রিপোর্টার্স২৪/এসসি