স্টাফ রিপোর্টার: মূল সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বইটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
প্রেস উইং জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ‘যথেষ্ট হয়েছে’ বলেই লাখো মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সেই গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং গভীর অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক সংকটের মধ্যে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও দুঃশাসনে রাষ্ট্রের ভেতরের কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ পাচার, ব্যাংকিং খাতে অনুৎপাদক ঋণের বিস্তার, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপব্যবহার এবং বিচার বিভাগের রাজনৈতিকীকরণের ফলে ভোটারবিহীন নির্বাচন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকোচন ও নাগরিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং খাতভিত্তিক সংস্কারের সুপারিশ গ্রহণ করে। কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এবং নিজস্ব উদ্যোগে সরকার ব্যাপক আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে।
বিবৃতিতে জানানো হয়, দায়িত্ব গ্রহণের ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে এবং ৬০০টির বেশি নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এসব সিদ্ধান্তের প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, যা প্রতীকী নয়,বাস্তব সংস্কারের প্রতিফলন বলে উল্লেখ করা হয়।
অর্থনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা তুলে ধরে বলা হয়, জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির ফলে প্রায় ৭ হাজার ৪০০ বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। চীনের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতায় ঋণের মেয়াদ পুনর্গঠন, স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন ও বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে কমে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও সম্মানজনক ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে শত শত রাজনীতিবিদ ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী মামলা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বাস্তব তদারকি চালু, ৪২টি মন্ত্রণালয়ে ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কারে তদন্তাধীন এক হাজারের বেশি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। র্যাব পুনর্গঠন করে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’। একই সঙ্গে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় সত্য ও জবাবদিহিতার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাহী হস্তক্ষেপের অবসান ঘটানো হয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলাগুলো প্রত্যাহার এবং পূর্বে নিষিদ্ধ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সাত মাসব্যাপী জাতীয় পরামর্শ শেষে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা সাংবিধানিক সংস্কারের মৌলিক দলিল হিসেবে গণভোটের অপেক্ষায় রয়েছে।
শেষে বলা হয়, ষোল বছরের ক্ষতি ১৮ মাসে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশ কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে সরে এসে গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে জনগণের সাহসী অবস্থানই সেই পথচলার প্রেরণা।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি