অনলাইন ডেস্ক: মিয়ানমারের সাবেক জান্তা প্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং বৃহস্পতিবার বেসামরিক নেতা হিসেবে প্রথমবারের মতো থাইল্যান্ড সফর করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে হয়ে পড়া মিয়ানমারকে আবারও কূটনৈতিক মূলধারায় ফিরিয়ে আনাই এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
২০২১ সালে মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক নেতা অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যাতে বিভিন্ন পক্ষের সংঘাতে এখন পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হয়।
গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের পর মিন অং হ্লাইং মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তবে গণতন্ত্র পর্যবেক্ষক সংস্থা ও পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনটিকে প্রহসন বলে আখ্যা দিয়ে জান্তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অভ্যুত্থানের পর থেকে আসিয়ান মিয়ানমারের শীর্ষ নেতৃত্বকে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানায়নি। তবে সম্প্রতি ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঞ্চলিক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে যোগ দেন। একই সময়ে থাইল্যান্ড দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ ও আসিয়ানের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা জোরদার করেছে।
বেসামরিক পরিচয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর মিন অং হ্লাইং কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি ভারত, চীন ও লাওস সফর করেছেন। থাইল্যান্ড সফরের আগে সোমবার গৃহবন্দি অং সান সু চিকে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) এক প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হয়। ২০২১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রথম কোনো বিদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলো।
মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মরগান মাইকেলস বলেন, আসিয়ানে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ভারত, চীন, রাশিয়া ও থাইল্যান্ডের স্বীকৃতি ইতোমধ্যেই পেয়েছে মিয়ানমার। তাই আসিয়ানে ফেরা গুরুত্বপূর্ণ হলেও একেবারে অপরিহার্য নয়।
স্বাধীন বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসনের মতে, আসিয়ানে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য মূলত মর্যাদার বিষয়। যদিও মিয়ানমারের বর্তমান নেতৃত্ব সংঘাত নিরসনে আসিয়ানের ঘোষিত ‘ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস’ গ্রহণে অনাগ্রহী।
থাইল্যান্ডের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ব্যাংককের গভর্নমেন্ট হাউসে মিন অং হ্লাইংকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চানভিরাকুলের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সফরকালে তিনি একটি ব্যবসায়িক ফোরাম ও সরকারি নৈশভোজে অংশ নেবেন। এ সময় দুই দেশের মধ্যে শ্রম সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই সফর নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, মিন অং হ্লাইংকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো থাইল্যান্ডের উচিত নয়। তার বিরুদ্ধে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তাকে খুঁজছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমালোচনা সত্ত্বেও মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বাস্তব কারণ রয়েছে থাইল্যান্ডের। সীমান্তজুড়ে চলমান সংঘাত, বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর চাপ, সাইবার প্রতারণা চক্র এবং মাদক পাচারের মতো নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও বলেছেন, সাইবার অপরাধ দমনে মিয়ানমার ও কম্বোডিয়ার আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। মিন অং হ্লাইংয়ের সফরে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসবে বলে তিনি জানান।
এক বিবৃতিতে তিনি অং সান সু চির সঙ্গে আইসিআরসি প্রতিনিধির সাক্ষাৎকে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দেশটিতে টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আরও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ