আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধে সামরিক জান্তার বাধ্যতামূলক সৈন্যভর্তি নীতি বিদ্রোহী বাহিনীর জন্য নতুন এবং বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একসময় যেসব তরুণ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন, তাদের জোরপূর্বক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সহায়তায় বিমান শক্তি বৃদ্ধি, ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বিদ্রোহীদের অস্ত্রসংকট—সব মিলিয়ে সংঘাতের গতিপথে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিবিসির এক প্রতিবেদন বলছে, যুদ্ধের শুরুতে যে গতি বিদ্রোহীরা অর্জন করেছিল, বর্তমানে অনেক এলাকাতেই তারা প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে চার তরুণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে, যাদের কেউই স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি। একজন ছিলেন রাঁধুনি। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পরিচয়পত্র না থাকায় তাকে আটক করে সেনাবাহিনীতে পাঠানো হয়। আরেকজনকে গভীর রাতে কারাওকে থেকে ফেরার পথে তুলে নেওয়া হয়। তৃতীয় ব্যক্তি বন বিভাগে চাকরি করতেন। চতুর্থজনের দাবি, তাকে গ্রেপ্তারের সময় জুতোর মধ্যে মাদক গুঁজে দিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয় এবং পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী এই চার তরুণকে অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সৈন্যদের ওপরই অধিকাংশ কঠিন কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হতো। দিনের পর দিন পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হতো, যেখানে নিয়মিত সৈন্যদের তুলনামূলক কম কষ্ট করতে হতো। চার মাসের প্রশিক্ষণের পর তাদের কারেন রাজ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। পরে এক রাতে সুযোগ বুঝে তারা পালিয়ে যান। পালানোর পর পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) সদস্যদের হাতে আটক হলেও সেখানে মানবিক আচরণ পান এবং আপাতত বিদ্রোহীদের সঙ্গেই অবস্থান করছেন। ভবিষ্যতে তাদের থাইল্যান্ড সীমান্তে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাদের পরিচয় গোপন রেখেছে বিবিসি।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। অং সান সুচিকে কারাবন্দি করার পর দেশজুড়ে গণআন্দোলন দমন করতে গিয়ে সশস্ত্র সংঘাতের জন্ম হয়। বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ আন্দোলন প্রথম দিকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। তারা একের পর এক সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করতে সক্ষম হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। যদিও সামরিক জান্তা এখনো দেশের অর্ধেকের বেশি এলাকা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি, তবু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহর পুনর্দখল করেছে এবং উত্তরাঞ্চলের মান্দালয় থেকে মিতকিনা পর্যন্ত কৌশলগত সড়কের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে।
বিদ্রোহী বাহিনীর কমান্ডারদের মতে, এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ বাধ্যতামূলক সৈন্যভর্তি আইন। ২০২৪ সালে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর সামরিক বাহিনী কার্যত সীমাহীন জনবল সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছে। প্রতিরোধযোদ্ধারা প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত কিছু সুবিধা কাজে লাগালেও অর্থ ও সরঞ্জামের অভাবে তারা নতুন যোদ্ধা নিয়োগ কিংবা যুদ্ধ পরিচালনায় পিছিয়ে পড়ছে। বিপরীতে সামরিক বাহিনী নিয়মিত নতুন সদস্য যুক্ত করে নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে চলেছে।
কারেন রাজ্যের হপাপুন এলাকায় বিদ্রোহী বাহিনীর কমান্ডাররা এখন আরও কঠিন সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একসময় তারা ওই শহর এবং একটি বড় সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে আকাশে নিয়মিত জান্তার ড্রোন টহল দিচ্ছে এবং কয়েক হাজার সৈন্য নতুন করে ওই অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিদ্রোহী নেতাদের মতে, অনিচ্ছাকৃতভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তরুণদের অনেকেই সময়ের সঙ্গে দক্ষ যোদ্ধায় পরিণত হচ্ছে। কারণ তারা ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ পাচ্ছে এবং কঠোর সামরিক শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে যুদ্ধ পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করছে।
যুদ্ধের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। বিদ্রোহী নেতাদের দাবি, রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির পর সামরিক বাহিনীর বিমান শক্তি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আগে বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হলেও এখন একাধিক যুদ্ধবিমান একসঙ্গে অভিযান চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সংখ্যা ও সক্ষমতা—দুই দিক থেকেই সামরিক বাহিনী সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বিদ্রোহীদের কাছে প্রয়োজনীয় ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা কিংবা জ্যামিং প্রযুক্তি না থাকায় এই হুমকি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে অস্ত্র ও গোলাবারুদের সংকট। চীনের মধ্যস্থতায় কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এবং সীমান্তপথে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রতিরোধযোদ্ধাদের সক্ষমতা কমে গেছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধে আহত এক প্লাটুন কমান্ডার জানান, অনেক সময় গুলি বাঁচিয়ে ব্যবহার করতে হচ্ছে। অস্ত্রের অভাব এখন বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিয়ানমারের সংঘাতকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে স্থলমাইন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটি বিশ্বের অন্যতম মাইন-আক্রান্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। শুধু গত বছরই স্থলমাইনের বিস্ফোরণে ৭৪৫ জন নিহত বা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু রয়েছে। সাম্প্রতিক এক বিস্ফোরণে গুরুতর আহত এক বিদ্রোহী কমান্ডারের ডান পায়ের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাধিক অস্ত্রোপচারের পরও তিনি সুস্থ হয়ে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরতে চান।
জঙ্গলের গভীরে সীমিত সামর্থ্যে পরিচালিত একটি ফিল্ড হাসপাতাল এই যুদ্ধের আরেকটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। বাঁশ ও কাঠের তৈরি কয়েকটি কক্ষ নিয়ে গড়ে ওঠা হাসপাতালটিতে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাকআপ জেনারেটরের সাহায্যে অস্ত্রোপচার করা হয়। অর্থ ও চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকটের পাশাপাশি সেখানে কোনো অ্যাম্বুলেন্সও নেই। তবু সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও চিকিৎসক ডা. সাউং আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন এবং তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করছেন।
এই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতার মাঝেও নতুন জীবনের গল্প আছে। সম্প্রতি ওই ফিল্ড হাসপাতালেই এক বিদ্রোহী যোদ্ধার স্ত্রী কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। শিশুটির নাম রাখা হয়েছে ‘সু পায়ে’, যার অর্থ পূরণ হওয়া ইচ্ছা। যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও নবজাতককে ঘিরে পরিবারের স্বপ্ন একটাই—সে যেন একটি স্বাধীন, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক মিয়ানমারে বড় হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে জান্তা-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকা স্বজনদের সঙ্গে তাদের দেখা করার সুযোগ না থাকলেও তারা বিশ্বাস করেন, একদিন সংঘাতের অবসান হবে এবং শান্তি ফিরে আসবে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব