আশিস গুপ্ত : পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-এর নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রাজ্যের দীর্ঘদিনের চেনা রাজনৈতিক সমীকরণটি এবার আমূল বদলে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে শাসক দল সাধারণত যে 'প্রশাসনিক সুরক্ষা কবচ' ভোগ করে থাকে, ২০২৬-এর নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বাংলার রাজনীতিতে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদত ছাড়া কোনো শাসক দলের পক্ষেই বুথ স্তরে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অতি-সক্রিয়তা এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজিরবিহীন মোতায়েন সেই চেনা সমীকরণকে আমূল বদলে দিয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের গত ১৫ বছরের নির্বাচনী রণকৌশলের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল নিপুণ 'বুথ ম্যানেজমেন্ট'। অভিযোগ ছিল যে, রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনের একটি অংশ পরোক্ষভাবে শাসকদলের ক্যাডার বাহিনীর মতো কাজ করত, যার ফলে বিরোধী দলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই বুথ এজেন্ট বসাতে বা ভোটারদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হতো। কিন্তু এবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কমিশন যেভাবে একের পর এক জেলা শাসক (DM) ও পুলিশ সুপারদের (SP) অপসারণ করেছে, তাতে তৃণমূলের সেই প্রশাসনিক গ্রিপ বা রাশ আলগা হয়ে যায়।
প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে এই রদবদল নীচুতলার কর্মীদের মধ্যে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল যে, এবার 'অ্যাডভান্টেজ রুলিং পার্টি' আর কাজ করবে না। সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ৪০ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, যেখানে ভোট মানেই হিংসার এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, সেখানে এত বিপুল সংখ্যক বাহিনীর মোতায়েন ছিল কার্যত অভূতপূর্ব।
প্রতি বুথে এবং বুথের বাইরে আধাসামরিক বাহিনীর এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা সাধারণ ভোটারদের, বিশেষ করে যারা শাসকদলের ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে দ্বিধাবোধ করতেন, তাঁদের মধ্যে বিপুল আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। মানুষ যখন বুঝতে পেরেছে যে বুথের ভেতর এবং বাইরে কোনো 'দাদাগিরি' চলবে না এবং তাদের ভোটটি গোপনেই থাকবে, তখনই তৃণমূলের সেই সুসংগঠিত ভোটযন্ত্রটি অকেজো হয়ে পড়ে। নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তৃণমূলের লাগাতার বিষোদগার এবং সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার প্রচেষ্টাই প্রমাণ করে দেয় যে, তারা এই নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কড়াকড়িকে নিজেদের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছিল।
শাসকদল বারবার দাবি করেছে যে কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছে বা বিজেপিকে সুবিধা দিচ্ছে, কিন্তু ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও উচ্চ শতাংশের হার প্রমাণ করেছে যে সাধারণ মানুষ এই কড়াকড়িকে স্বাগত জানিয়েছেন। আসলে যে বিপুল সংখ্যক ভুয়া ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছিল (এসআইআর-এর ফলে), তাদের বদলে প্রক্সি দেওয়ার কোনো সুযোগই এবার কেন্দ্রীয় বাহিনী রাখেনি।
অন্যভাবে বললে, তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের জন্য যে 'অবাধ' প্রশাসনিক পরিবেশের প্রয়োজন ছিল, নির্বাচন কমিশন তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয়তা কেবল বুথ দখলই আটকায়নি, বরং গ্রামীণ এলাকায় যে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বাতাবরণ তৈরি করে ভোটারদের ঘরে বসিয়ে রাখা হতো, সেই সংস্কৃতিতেও ইতি টেনেছে। এর ফলে যে 'সাইলেন্ট ভোটার'রা এতদিন প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি কিন্তু মনে মনে পরিবর্তনের সংকল্প নিয়েছিলেন, তাঁরা নির্ভয়ে বুথ পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় থাকায় তৃণমূলের সেই চিরাচরিত নির্বাচনী শক্তির উৎস—অর্থাৎ প্রশাসন ও পুলিশ—আর তাদের বৈতরণী পার করতে কোনো সাহায্য করতে পারল না। এটিই ছিল ২০২৬-এ তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারিগরি বা টেকনিক্যাল কারণ।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তৃণমূল কংগ্রেস নারী ভোটারদের একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলেছিল, যেখানে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা কন্যাশ্রীর মতো প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধাগুলো এক ধরনের সামাজিক চুক্তি হিসেবে কাজ করত। তবে উত্তর কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরতা মহিলা চিকিৎসক ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনা -পরবর্তী আবহে এই চুক্তিতে ফাটল ধরার প্রধান কারণ হলো আর্থিক সুরক্ষার ওপর জীবনের নিরাপত্তার প্রাধান্য।
যখন একজন নারী চিকিৎসক কর্মক্ষেত্রে চরম লাঞ্ছনার শিকার হন এবং তার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি হয়, তখন সরকারি অনুদানের চেয়েও 'বিচার' এবং 'নিরাপত্তা' অনেক বড় আবেগীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।
পানিহাটির মতো তৃণমূলের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতে নির্যাতিতার মায়ের জয় কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং এটি শাসকদলের প্রতি নারী সমাজের এক গভীর অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। এই জয় প্রমাণ করে যে, সাধারণ গৃহবধূ থেকে শুরু করে কর্মজীবী নারী—সবার কাছেই এখন আরজি করের ঘটনাটি একটি ব্যক্তিগত ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কোনো মাসিক ভাতা দিয়ে মেরামত করা সম্ভব নয়।
ভোটাররা এখন প্রকল্পের উপভোক্তা পরিচয়ের চেয়েও নিজেদের নাগরিক অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যার ফলে তৃণমূলের সেই সুসংহত মহিলা ভোটব্যাংক আজ খণ্ডবিখণ্ড । এই পরিবর্তন নির্দেশ করে যে, কেবল আর্থিক সুবিধা দিয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে যখন প্রশাসন মৌলিক মানবিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। মূলত পানিহাটির এই ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের একটি প্রতীকী রূপান্তর, যেখানে অনুদান নয় বরং বিচারই হয়ে উঠেছে শ্রেষ্ঠ পাওনা।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' বা Special Intensive Revision (SIR) প্রক্রিয়াটি রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণে একটি আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ লক্ষেরও বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া এবং তার বিপরীতে নতুন নাম সংযোজন করার ফলে যে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে, তাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতির একটি বড় শক্তি ছিল বুথ স্তরে তাদের সুশৃঙ্খল সংগঠন এবং নির্দিষ্ট কিছু পকেট যেখানে তারা বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করত, কিন্তু বিজেপির অভিযোগ ছিল যে এই "নিশ্চিত ভোটব্যাংক" তৈরিতে বহু মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটার এবং বেআইনিভাবে নাম নথিভুক্ত করা ব্যক্তিদের ব্যবহার করা হতো।
রাজনৈতিক ফলাফল নির্ধারণে SIR যে অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় সেই ১৫০টি আসনে যেখানে জয়ের ব্যবধান ছিল মোট ভোটার বাতিলের (ASDD এবং UA) সংখ্যার চেয়েও কম। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে এই সংখ্যাটি অর্ধেকেরও বেশি এবং এই আসনগুলোর মধ্যে বিজেপি ১০০টি আসনে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৪৮টি এবং কংগ্রেস ২টি আসনে এগিয়ে ছিল। অথচ ২০২১ সালের নির্বাচনে এই একই আসনগুলোর মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ১৩১টিতে এবং বিজেপি জিতেছিল মাত্র ১৯টিতে। কলকাতার পার্শ্ববর্তী দুটি জেলা ভোটার তালিকা সংকোচনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মোট অতি-প্রভাবিত আসনগুলোর প্রায় ৩০ শতাংশ। উত্তর ২৪ পরগনায় ২০২১ সালে তৃণমূল ২৬টি প্রভাবিত আসনের মধ্যে ২৩টিতে জিতে আধিপত্য বজায় রেখেছিল, কিন্তু ২০২৬ সালে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টে যায় এবং বিজেপি এর মধ্যে ২১টি আসন দখল করে।
একইভাবে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূল আগে ১৯টি আসনের সবকটিতেই জিতেছিল, কিন্তু SIR-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিজেপি সেখানে ১০টি আসন ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এই মূল কেন্দ্রগুলোর বাইরেও নেট ভোটার তালিকা সংকোচন মুসলিম-প্রধান এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক জেলাগুলোতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। মুর্শিদাবাদে ২০২১ সালে ১৫টি প্রভাবিত আসনের মধ্যে তৃণমূলের ১৩টি আসন কমে মাত্র ৬টিতে দাঁড়িয়েছে এবং পূর্ব বর্ধমানে তৃণমূল তাদের আগের ১৩টি আসনের মধ্যে ১১টি বিজেপির কাছে হারিয়েছে।
একই চিত্র দেখা গেছে হাওড়া এবং হুগলিতেও, যেখানে প্রভাবিত ২২টি আসনের সবকটিই ২০২১ সালে তৃণমূল জিতলেও সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপি তার মধ্যে ১৪টি আসন দখল করেছে। পরিসংখ্যানগতভাবে দেখা যায় যে, অনেক বুথে যেখানে আগের নির্বাচনে ভোট পড়ার হার অস্বাভাবিক বেশি ছিল, তালিকা সংশোধনের পর সেখানে ভোটার সংখ্যা ৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিজেপি দীর্ঘকাল ধরেই দাবি করে আসছিল যে প্রায় ১ কোটি ভুয়া ভোটার তৃণমূলকে অন্তত ২০ থেকে ৩০টি আসনে বাড়তি সুবিধা দেয় এবং তালিকা থেকে এই বিশাল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়ার ফলে জয়ের ব্যবধান সামান্য থাকা আসনগুলোতে বিজেপির পথ সহজ হয়েছে।
যদিও তৃণমূল কংগ্রেস এই বিষয়টিকে "ভোটাধিকার হরণ" বা "এনআরসি-র রিহার্সাল" হিসেবে প্রচার করে সহমর্মিতা পাওয়ার চেষ্টা করেছে, তবে সামগ্রিকভাবে মৃত বা জাল ভোটারদের নাম বাদ যাওয়াকে সাধারণ মানুষ স্বচ্ছ নির্বাচনের পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছে। যেখানে ৫০০০ থেকে ১০০০০ ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়, সেখানে তালিকা থেকে ১০০০-১৫০০ ভুয়া নাম বাদ পড়াই বিজেপির মতো বিরোধী শক্তির জন্য গেম চেঞ্জার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা স্পষ্ট যে ভোটার তালিকায় এই নিবিড় সংশোধন তৃণমূলের চিরাচরিত নির্বাচনী কৌশলের মূলে কুঠারাঘাত করেছে এবং পক্ষান্তরে বিজেপির অবস্থানকে টেকনিক্যালি শক্তিশালী করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' বা 'স্বাস্থ্যসাথী'র মতো প্রকল্পগুলো। ২০১৬ বা ২০২১ সালে ভোটাররা যখন ভোট দিতে গিয়েছেন, তখন তাঁরা দুর্নীতি বা অপশাসনের চেয়ে নিজেদের পকেটে আসা নিশ্চিত টাকাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৬-এ এসে সেই রসায়ন বদলে গেছে। এর প্রধান কারণ হলো 'জীবনযাত্রার মান' ও 'ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা'।
১৫ বছরে শিল্পায়নের অভাব এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থতা এক বিশাল শিক্ষিত বেকার সমাজ তৈরি করেছে। যখন একজন যুবক দেখেন যে তার সরকারি চাকরির অধিকার 'তৃণমূলের অফিস' বা 'টাকার বিনিময়ে' বিক্রি হয়ে গেছে, তখন মাসিক ১৫০০ টাকার বেকার ভাতা তার কাছে প্রলেপ নয়, বরং উপহাস হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছে। দুর্নীতির এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ—যা শিক্ষা দপ্তর থেকে শুরু করে রেশন বন্টন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল—সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি করেছে যে, তৃণমূল সরকার কেবল সুবিধাভোগী তৈরি করতে চায়, কারোর ভবিষ্যৎ গড়তে নয়।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও 'সিন্ডিকেট রাজ' তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত্তিকেই ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য করে দিয়েছিল। বাড়ি তৈরি থেকে শুরু করে ব্যবসার লাইসেন্স—প্রতিটি পদক্ষেপে 'কাটমানি' দেওয়ার সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। মমতা ব্যানার্জী ব্যক্তিগতভাবে 'বাঙালির আত্মাভিমান' বা 'অসাম্প্রদায়িকতা'র তাস খেলে বারবার আবেগ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করলেও, আরজি করের মতো ঘটনা এবং নারী নিরাপত্তার অভাব সেই আবেগের দেওয়ালে বড়সড় ফাটল ধরিয়ে দেয়। মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে, 'নিজের মেয়ে' স্লোগানটি কেবল ভোটের বিজ্ঞাপনেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে রাজ্যের কন্যারা সুরক্ষিত নন।
এসআইআর (ভোটার তালিকা সংশোধন) নিয়ে মমতা ব্যানার্জীর আইনি লড়াই এবং সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করার বিষয়টি ছিল মূলত একটি রক্ষণাত্মক কৌশল। তিনি চেয়েছিলেন লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়াকে "বাঙালি ও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ" হিসেবে তুলে ধরে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে এবং একটি 'ভিক্টিম কার্ড' খেলতে। তিনি ভেবেছিলেন এতে করে ভোটাররা ক্ষোভ ভুলে পুনরায় তাঁর ছাতার তলায় জড়ো হবেন। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল, ৯০ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার ফলে যে স্বচ্ছতা তৈরি হয়েছে, তাতে তৃণমূলের সেই পুরনো 'ফলস ভোটিং' বা 'বুথ জ্যামিং'-এর পেশ পেশিশক্তি কাজ করেনি। ভুয়া ভোটারের নাম বাদ যাওয়ায় এবং বৈধ ভোটারদের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভ থাকায় শাসকদলের যে বিশাল ভোটের ব্যবধান (Margin) থাকত, তা নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
২০২৬-এ তৃণমূলের এই পতনের মূলে রয়েছে 'আস্থা হারানো'। মানুষ যখন অনুভব করে যে একটি সরকার কেবল নির্বাচনের কয়েক মাস আগে প্রকল্প ঘোষণা করে তাদের তুষ্ট করতে চায় কিন্তু বছরের বাকি সময় তাদের অধিকার হরণ করে এবং জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন কোনো আবেগ বা অনুদানই আর রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে না। দুর্নীতি যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং বেকারত্ব যখন ঘরে ঘরে হাহাকার নিয়ে আসে, তখন 'কাটমানি' ও 'সিন্ডিকেট রাজে'র মাশুল ব্যালট বক্সেই দিতে হয়—পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-এর ফলাফল তারই ঐতিহাসিক প্রমাণ।
গত দেড় দশকে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতার যে রসায়ন কাজ করত, তাতে মূলত তিনটি বড় স্তম্ভ ছিল—ডাইরেক্ট বেনেফিট প্রকল্প, প্রায় একচেটিয়া মুসলিম ভোট এবং বিভক্ত হিন্দু ভোট। কিন্তু এবারের নির্বাচনে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের এক অভূতপূর্ব মেরুকরণ বা 'কনসলিডেশন' তৃণমূলের সেই রাজনৈতিক পাটিগণিতকে ওলটপালট করে দিয়েছে।
মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক সাফল্যের মূলে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটব্যাংকের যে নিরঙ্কুশ সমর্থন ছিল, তা তাকে প্রায় ১০০টির কাছাকাছি আসনে একতরফা সুবিধা দিত। বিজেপি এই ৩০ শতাংশ ভোটের পাল্টা ৭০ শতাংশ হিন্দু ভোটের একজোট হওয়ার ডাক দীর্ঘকাল ধরে দিয়ে আসলেও, ২০২১ সাল পর্যন্ত তা সফল হয়নি কারণ হিন্দু ভোট ছিল বহুলাংশে বিভক্ত। কিন্তু ২০২৬-এ এসে পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ার প্রধান কারণ হলো সাধারণ হিন্দু ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের 'রিঅ্যাকশন' বা প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া।
আরজি কর কাণ্ড বা সন্দেশখালির মতো ঘটনাগুলোতে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, সরকার নির্দিষ্ট কিছু ভোটব্যাংককে রক্ষা করতে গিয়ে সাধারণ বিচারব্যবস্থা ও আইন-শৃঙ্খলাকে শিথিল করে দিচ্ছে। এই ক্ষোভ থেকেই হিন্দু ভোটের একটি বড় অংশ কোনো বিভাজন ছাড়াই সরাসরি বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। তৃণমূল নেত্রী যখন দেখলেন যে তার বিরুদ্ধে 'মুসলিম তোষণ'-এর অভিযোগটি সাধারণ হিন্দু ভোটারদের মধ্যে প্রবল প্রভাব ফেলছে, তখন তিনি 'সফট হিন্দুত্ব'-এর পথে হাঁটা শুরু করেন।
সরকারি খরচে তারকেশ্বর বা গঙ্গাসাগরের উন্নয়ন, মন্দির সংস্কার এবং ব্রাহ্মণ ভাতা চালু করার মতো পদক্ষেপগুলো ছিল মূলত ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে 'সফট হিন্দুত্ব' কখনও 'হার্ডলাইন হিন্দুত্ব'-এর বিকল্প হতে পারে না। ভোটারদের কাছে যখন আসল (বিজেপি) এবং নকল (তৃণমূলের হিন্দু মন্দির নীতি) বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল, তখন তারা অরিজিনাল হিন্দুত্ববাদী শক্তিকেই বেছে নিয়েছে।
মানুষ সম্ভবত এই মন্দির নির্মাণের রাজনীতিকে তৃণমূলের একটি 'নির্বাচনী কৌশল' হিসেবেই দেখেছে, আন্তরিক বিশ্বাসের প্রতিফলন হিসেবে নয়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে মালদা বা মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম-গরিষ্ঠ জেলাগুলোতে। এই জেলাগুলোতে বিজেপির কিছু আসন পাওয়ার অর্থ হলো, সেখানে হিন্দু ভোট এতটাই নিবিড়ভাবে একজোট হয়েছে যে তা মুসলিম ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
এর পাশাপাশি, এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে যে ভুয়া নামগুলো বাদ পড়েছে, তার একটি বড় অংশ ছিল এই সীমান্ত জেলাগুলোতে—যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তৃণমূলের ভোটসংখ্যার ওপর। মুসলিম সমাজের শিক্ষিত একটি অংশও সম্ভবত দুর্নীতির প্রশ্নে বা কর্মসংস্থানের অভাবে তৃণমূলের থেকে মুখ ফিরিয়ে সিপিএম বা কংগ্রেসের মতো বিকল্প জোটকে ভোট দিয়েছে, যার ফলে তৃণমূলের সেই ৮৫-৯০ শতাংশের ভোটব্যাংকে ভাঙন ধরেছে। ২০২৬-এর এই মেরুকরণ কেবল ধর্মীয় নয়, বরং তা ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
একদিকে তৃণমূলের 'সংখ্যালঘু নির্ভরতা' এবং অন্যদিকে হিন্দু ভোটারদের মধ্যে তৈরি হওয়া 'বঞ্চনার বোধ'—এই দুইয়ের সংঘর্ষে বিজেপির হিন্দু ভোট কনসলিডেশন সফল হয়েছে। মমতা ব্যানার্জীর মন্দির কেন্দ্রিক রাজনীতি বা সফট হিন্দুত্ব এই মেরুকরণ আটকাতে পারেনি কারণ মানুষের কাছে তখন আরজি করের ন্যায়বিচার এবং কাটমানি-মুক্ত প্রশাসনের দাবি অনেক বেশি বাস্তব ও স্পর্শকাতর ইস্যু ছিল। ফলে ৩০ শতাংশ ভোটের ওপর দাঁড়িয়ে জয় নিশ্চিত করার যে ফর্মুলা এতদিন তৃণমূলকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, হিন্দু ভোটের ব্যাপক একীকরণে সেই রক্ষাকবচ এবার চুরমার হয়ে গেছে।
রিপোর্টার্স/এসএন
[ আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের ‘মতামত’ একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ ]