আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নতুন করে কূটনৈতিক সংকটে পড়েছে ইরাক। দেশটির ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষুব্ধ হয়ে ছয়টি আরব দেশ একযোগে নিন্দা জানিয়েছে এবং এসব হামলার দায় বাগদাদের ওপর বর্তেছে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং জর্ডান এক যৌথ বিবৃতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামোর ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। তারা এসব হামলাকে সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে।
বিবৃতিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের উল্লেখ করে বলা হয়, সীমান্তপারের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকারও রয়েছে বলে দাবি করেছে দেশগুলো। তারা ইরাক সরকারের প্রতি নিজ ভূখণ্ডে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানিয়েছে।
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা ইরাকের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ। বাগদাদ দাবি করেছে, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো প্রতিবেশী দেশে হামলা চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে না এবং এ বিষয়ে তারা সাংবিধানিক ও আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে হামলার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে এসব গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় ইরাকের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ছে। অবসরপ্রাপ্ত ইরাকি মেজর জেনারেল মাজেদ আল-কায়েসির দাবি, ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ ছাতার নিচে থাকা গোষ্ঠীগুলো প্রতিদিন ২১ থেকে ৩১টি হামলা চালাচ্ছে, যা উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে।
তার মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এসব গোষ্ঠী ৪৫০টির বেশি হামলা চালিয়েছে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। বাগদাদের প্রতিক্রিয়া মূলত কূটনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার জন্য, বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিফলন নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান দাবি করে আসছে, তারা মূলত অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলো অভিযোগ করছে, জ্বালানি স্থাপনা, শিল্প কারখানা ও হোটেলসহ বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক আইনি দায় এড়াতে ইরান ইরাকভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করছে।
দোহার ‘মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর পরিচালক খালেদ আল-জাবের বলেন, সরাসরি রাষ্ট্রীয় হামলা থেকে সরে এসে প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে হামলা চালানো ইরানের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে দায়-দায়িত্ব অস্পষ্ট থাকে এবং প্রতিপক্ষ দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও সীমিত থাকে।
এদিকে, কুয়েতের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আহমেদ আবদেল মোহসেন আল-মুলাইফি সতর্ক করে বলেন, কোনো রাষ্ট্র যদি তার ভূখণ্ডে আইনবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে তাকে পূর্ণ সার্বভৌম বলা যায় না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে স্থল অভিযান চালালে তেহরান ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনভিত্তিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করে নতুন সংঘাতের ফ্রন্ট খুলে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে ইরাক আঞ্চলিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর ধৈর্যের সীমা ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই নিজেদের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করা এখন বাগদাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি