এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
আল-কুদস' দিবস হলো বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জাগরণের দিন ও ফিলিস্তিন মুক্তির অঙ্গীকারের প্রতীক। এই দিনে বিশ্বজুড়ে জনগণের ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ফিলিস্তিনিদের আশা-আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত রাখা এবং ইসরায়েলের প্রতি বিশ্ব মুসলমানের প্রতিবাদ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। মজলুম ফিলিস্তিনি জাতির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চাপিয়ে বসা ইহুদি শাসন, শোষণ, নিপীড়ন ও তাদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের অবসান ঘটানো এবং বায়তুল মোকাদ্দাসকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের সকল মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এই দিবস।
আল-কুদস দিবস বা আন্তর্জাতিক আল-কুদস দিবস (ফার্সি: روز جهانی قدس) প্রতি বছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার পালিত হয়। এটি ১৯৭৯ সালে ইরানে শুরু হয়। দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনী জনগণের সাথে একাত্মতা প্রকাশ, জায়নবাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখানো এবং ইসরায়েলের দ্বারা জেরুজালেম দখলের প্রতিবাদ। জেরুজালেমকে আরবি ভাষায় 'কুদস' বা 'আল-কুদস' বলা হয়।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইবরাহীম ইয়াজদি সর্বপ্রথম আল-কুদস দিবস র্যালি আয়োজনের ধারণা দেন। এরপর আয়াতুল্লাহ খোমেইনী (রহ.) ১৯৭৯ সালে ইরানে দিবসটি প্রবর্তন করেন। এরপর থেকে প্রতি বছর আল-কুদস দিবসে প্যারেড ও বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মশুদ্ধি ও সংযমের মাস। দৈহিক ও আত্মিক সংযমের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণকর্মে সাফল্যের সোপানে আরোহণ সম্ভব হয়।
ফিলিস্তিন ও পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস দখলদার ইহুদিবাদীদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য মুসলমানদের সচেতন করা আল-কুদস দিবসের অন্যতম লক্ষ্য। এছাড়াও, মজলুম ফিলিস্তিনি জাতির ওপর চাপিয়ে বসা ইহুদিবাদী শাসন, নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করা এবং বায়তুল মোকাদ্দাসকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা এ দিবসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
‘কুদস’ শব্দের অর্থ হলো পবিত্র। আল-কুদস বলতে বোঝায় ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে পবিত্র ভূমিতে অবস্থিত মসজিদ, যা মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস নামে পরিচিত। হজরত ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর তাঁর ছেলে হজরত ইসহাক (আ.)-এর সন্তান হজরত ইয়াকুব (আ.) ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে ‘আল আকসা’ মসজিদ নির্মাণ করেন। পরে তাঁর সন্তান হজরত দাউদ (আ.) এবং হজরত সুলায়মান (আ.) এটি পুনর্নির্মাণ করেন।
আদিতে কাবা কিবলা হলেও মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস স্থাপনের পর এটি মুসলমানদের প্রথম কিবলা হিসেবে স্বীকৃত হয়। নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও সাহাবাগণ প্রথমে মদিনা থেকে নামাজ আদায়ের সময় এই কিবলার দিকে মুখ করেন। পরে হজরত মুহাম্মদ (সা.) কিবলা পরিবর্তন করে কাবামুখী হয়ে নামাজ আদায় করেন। মদিনায় ‘মসজিদুল কিবলাতাইন’ বা দুই কিবলার মসজিদ এ ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক।
বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের কাছে সবসময় সম্মানিত। হাদিসে উল্লেখ আছে, মসজিদুল হারামে এক লক্ষ, মসজিদে নববীতে পঞ্চাশ হাজার, আর বায়তুল মুকাদ্দাসে পঁচিশ হাজার গুণ সওয়াব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিরাজের সময় মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা সফর করেন, যা ‘ইসরা’ নামে পরিচিত। এই এলাকা বহু নবী-রাসুলের স্মৃতিবিজড়িত এবং ইসলামি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ চারণভূমি।
বায়তুল মুকাদ্দাসের ইতিহাসে নানা সময়ে এটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানদের হাতে আসে। পরে সালাহ উদ্দীন আইয়ুবি ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে শহরটি পুনরায় মুসলমানদের হাতে আনে। ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে ১৯৪৮ সালে অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ইসরায়েলের অত্যাচারে ফিলিস্তিনিরা দেশের বাইরে পালাতে বাধ্য হয়।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে হজরত ইমাম খোমেইনি (রহ.) আল-কুদস ও ফিলিস্তিন মুক্তির জন্য বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে প্রতিবছর রমজানের শেষ শুক্রবার আল-কুদস দিবস পালন করার আহ্বান জানান। এরপর থেকে দিবসটি বিশ্ব মুসলিমদের মধ্যে ফিলিস্তিন মুক্তি ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ শুরু থেকে ফিলিস্তিন মুক্তির পক্ষে ছিল এবং এখনও আছে। বাংলাদেশ ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
চলতি বছর আল-কুদস দিবস পালিত হতে যাচ্ছে এমন এক সময়ে যখন ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে। মুসলিম বিশ্ব এই দিবসে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শপথ গ্রহণ করবে।
লেখক: রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]