রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: দেশের নারীপ্রধান পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে বিশেষ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত পরিবারগুলো প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে, কড়াইল বস্তি-সংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। সরকারের এই উদ্যোগকে নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই এই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারের লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথেই এটি একটি বড় পদক্ষেপ। তিনি জানান, সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা দলীয় প্রভাব রাখা হয়নি; সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রাথমিক বা পাইলট পর্যায়ে দেশের ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রতিটি পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা নির্ধারণের জন্য জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ওয়ার্ড কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়ের উৎস, শিক্ষার অবস্থা, বসতবাড়ির ধরন এবং গৃহস্থালি সামগ্রীর তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে মোট ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারীপ্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। এরপর স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ পদ্ধতিতে পরিবারের দারিদ্র্য সূচক নির্ণয় করা হয়। এতে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ৫১ হাজার ৮০৫টি পরিবারের তথ্য সঠিক হিসেবে চিহ্নিত হয়। পরে একই ব্যক্তির একাধিক ভাতা গ্রহণ, সরকারি চাকরি বা পেনশন সুবিধা থাকার মতো বিষয়গুলো যাচাই শেষে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে এই ভাতার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানায়, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারভিত্তিক হওয়ায় এতে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি বা মানবিক হস্তক্ষেপের সুযোগ ছিল না, ফলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রতিটি নির্বাচিত পরিবারকে একটি আধুনিক স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। স্পর্শবিহীন চিপসংবলিত এই কার্ডে কিউআর কোড ও এনএফসি প্রযুক্তি সংযুক্ত থাকবে, যা নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করবে। সাধারণত পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের জন্য একটি কার্ড দেওয়া হবে। তবে কোনো পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক কার্ড দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
যদি কোনো নারী গৃহপ্রধান বর্তমানে অন্য কোনো সরকারি ভাতা পেয়ে থাকেন, তাহলে ফ্যামিলি কার্ড সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে সেই ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাদের প্রাপ্য ভাতা বা সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা আগের মতোই পেতে পারবেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে সুবিধাভোগী পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এই কর্মসূচির আওতায় সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
সরকারি জি-টু-পি (গভর্নমেন্ট টু পারসন) পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এই অর্থ জমা হবে। এতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর হস্তক্ষেপ থাকবে না এবং অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্বও কমবে।
পাইলট পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আগামী জুন পর্যন্ত মোট ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে সুবিধাভোগীদের দেওয়া হবে এবং বাকি অর্থ অনলাইন ব্যবস্থাপনা ও কার্ড তৈরির কাজে ব্যয় করা হবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা কর্মসূচির কার্যক্রম পরিচালনায় নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম