জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুরের বুক চিরে প্রবাহিত যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদে শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই দেখা দিয়েছে তীব্র নাব্যতা সংকট। এতে ছোট-বড় অনেক নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জেলার বিভিন্ন খেয়াঘাটে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন দুর্ভোগে পড়ছেন হাজারো যাত্রী। একই সঙ্গে লোকসানের মুখে পড়েছেন ফেরি, খেয়া ও কুলঘাটের ইজারাদাররা।
নাব্যতা সংকটের কারণে যমুনার বাহাদুরাবাদ–বালাসী ও মাদারগঞ্জ–সারিয়াকান্দি নৌরুটসহ জেলার বিভিন্ন ছোট-বড় খেয়াঘাটে নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে নদীপথে যাতায়াতকারী যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
জানা গেছে, জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী কুড়িগ্রামের রৌমারী এলাকা থেকে টাঙ্গাইলের যমুনা সেতু এবং দেওয়ানগঞ্জ থেকে নান্দিনা পর্যন্ত জেলা পরিষদের আওতায় ১২টি খেয়াঘাট রয়েছে। নাব্যতা সংকটের কারণে এসব ঘাটে ছোট নৌযান চলাচলও প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে কোটি কোটি টাকার লোকসানের আশঙ্কায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ইজারাদাররা।
জামালপুর জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, জেলা পরিষদের আওতাধীন ১২টি খেয়াঘাটের মধ্যে রয়েছে— নান্দিনা হামিদপুর–লুন্দেরচর ফেরিঘাট ও কুলঘাট, নরুন্দী ছাতিয়ানতলা–তুলশীরচর ফেরিঘাট, জামতলী বাজার–ইটাইল ফেরিঘাট, আমলীতলা–তেন্দ্রাপাখিয়া (পাইলিং ঘাটসহ) ফেরিঘাট, গোয়ালেরচর (তিলকপুর ও সভারচর খেয়াসহ) ফেরিঘাট, সাপধরী গারামাড়া–নোয়ারপাড়া ফেরিঘাট ও কুলঘাট, কুলকান্দি মোরাদাবাদ ফেরিঘাট ও কুলঘাট, চিনাডুলী–বেলগাছা ফেরিঘাট ও কুলঘাট, গুনারীতলা ছুরিপাড়া খেয়াঘাট, নয়াপাড়া–আমলীতলা খেয়াঘাট, নবীনাবাজার–সানন্দবাড়ী বাজার ফেরিঘাট এবং আনন্দবাড়ী পশ্চিম–পারুলেরচর–ঘেঘারচরসহ হারুয়াবাড়ী ফেরিঘাট ও কুলঘাট। চলতি বছরে এসব ঘাট থেকে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৪৬ হাজার ১৬৪ টাকা ইজারা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় ইজারাদাররা লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
এদিকে বাহাদুরাবাদ–বালাসী ও মাদারগঞ্জ–সারিয়াকান্দি ফেরিঘাট পরিচালনা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নাব্যতা সংকটের কারণে বাহাদুরাবাদ–বালাসী নৌরুটে এখন ছোট-বড় সব ধরনের নৌচলাচল প্রায় বন্ধ। অথচ এই নৌরুটে ফেরি চলাচলের জন্য দুই ঘাটে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন অবকাঠামো। ২০২১ সালের জুন মাসে উদ্বোধন করা হয় বাহাদুরাবাদ–বালাসী নৌঘাট দুটি। বর্তমানে সেগুলো কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফেরি চলাচলের সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই সরকারি অর্থ ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। অথচ যমুনা বহুমুখী সেতু চালুর পর ২০০০ সাল থেকেই এই অঞ্চলে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, উত্তরের ১৩ জেলার সঙ্গে ময়মনসিংহ ও ঢাকার যোগাযোগ সহজ করতে এবং যমুনা সেতুতে যানবাহনের চাপ কমাতে ২০১৪ সালে বালাসী–বাহাদুরাবাদ নৌরুটে ফেরি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর একনেক সভায় এই প্রকল্প অনুমোদন পায়।
২০২২ সালের ৯ এপ্রিল নৌপথটি উদ্বোধন করা হয়। প্রথমে ফেরি চালুর পরিকল্পনা থাকলেও পরে লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হয়। শুরুতে দুটি এবং পরে ছয়টি লঞ্চ চলাচল করলেও কিছুদিন পর তা বন্ধ হয়ে যায়।
বাহাদুরাবাদ ঘাটের নৌযান ইজারাদার মনজুরুল হক বলেন, নাব্যতা সংকটের কারণে প্রতিদিন ডুবোচরে নৌকা আটকে যাচ্ছে এবং যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়ছেন। বর্তমানে এই রুটে সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এদিকে মাদারগঞ্জ–সারিয়াকান্দি নৌরুটের দূরত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুম শুরুতেই পানি কমে যাওয়ায় যমুনার বুকে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও ডুবোচর থাকায় নৌচলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। মাঝনদীতে আটকে যাচ্ছে ছোট নৌযান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না যাত্রীরা।
এই পথে নিয়মিত যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সড়কপথে মাদারগঞ্জ থেকে বগুড়া যেতে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের জন্যই অনেকেই এই নৌপথ ব্যবহার করতেন। কিন্তু বর্তমানে নাব্যতা সংকটের কারণে সেই সুযোগও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার বলেন, আগে নদীপথে মালামাল পরিবহন করতেন। কিন্তু নদীতে চর জেগে ওঠায় মালবোঝাই নৌকা চলাচল করতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে এখন সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত যমুনা নদী খননের মাধ্যমে নৌপথটি সচল করা হলে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি ফিরবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে জামালপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন বাবু জানান, কিছু কিছু ঘাট বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন