রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: দেশে প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি রোগী। চিকিৎসা ব্যয় বহনের সামর্থ্য না থাকায় বিপুলসংখ্যক ক্যানসার রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে অকালেই ঝরে যাচ্ছেন। এমন বাস্তবতায় অসচ্ছল রোগীদের জন্য ব্যয়বহুল ক্যানসার চিকিৎসায় বিকল্প অর্থায়নের জোরালো তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্যানসারের মতো জটিল রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চালাতে গিয়ে অধিকাংশ পরিবার তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলে। অনেককে বাড়িঘর, জমিজমা বিক্রি কিংবা ঋণের বোঝা টানতে হয়। ফলে ক্যানসার চিকিৎসা বহু পরিবারকে আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট পরিচালিত আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী জার্নাল অব ক্যানসার পলিসি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে একজন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় গড়ে ১২ হাজার ১১৭ মার্কিন ডলার ব্যয় হয়, যা দেশের অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের বহু গুণ বেশি।
গবেষণায় স্তন, জরায়ুমুখ ও মুখগহ্বর ক্যানসারে আক্রান্ত ৩৪৬ জন রোগী ও তাদের পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী পরিবারের প্রায় ৩৯ শতাংশের মাসিক আয় ২০ হাজার টাকার নিচে। রোগীদের বড় অংশ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে বসবাস করেন।
গবেষণা অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের প্রায় ৩৬ শতাংশ সরাসরি চিকিৎসা খাতে, ১৫ শতাংশের বেশি আয়হানিসহ পরোক্ষ ব্যয়ে এবং প্রায় ৪৪ শতাংশ মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও সামাজিক ভোগান্তির মতো অদৃশ্য ব্যয়ে ব্যয় হয়।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে একজন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় গড়ে ব্যয় হয় প্রায় ৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২৫ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। এই ব্যয় মেটাতে প্রায় ৭৮ শতাংশ পরিবারকে ঋণ নিতে হয় এবং ৪০ শতাংশ পরিবার সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩২ ধরনের ক্যানসার শনাক্ত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৪৫৮ জন নতুন রোগী ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন প্রায় ৩১৯ জন। প্রয়োজনের তুলনায় দেশে ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যাও অপ্রতুল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিমার অভাব, সীমিত দাতব্য সহায়তা এবং সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে ক্যানসার চিকিৎসা সবার জন্য সহজলভ্য নয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ৫০ হাজার টাকার সহায়তা এই ব্যয়বহুল চিকিৎসার তুলনায় অপ্রতুল।
বিকল্প অর্থায়নের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি হলেও চিকিৎসা ব্যয় বহনের জন্য জাতীয় পর্যায়ে বিকল্প অর্থায়ন গড়ে তুলতে হবে। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, মোবাইল ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে দৈনিক এক টাকা, তামাক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর এবং করপোরেট সিএসআর তহবিলের অংশ যুক্ত করে একটি ন্যাশনাল হেলথ ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। এতে বছরে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ সম্ভব, যা দিয়ে ক্যানসারসহ অন্যান্য ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসায় বড় পরিসরে সহায়তা দেওয়া যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একটি সমন্বিত বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা গেলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষও ক্যানসারের চিকিৎসার আওতায় আসবে এবং প্রতি বছর বহু মূল্যবান জীবন রক্ষা পাবে।
রিপোর্টার্স২৪/আরকে