গোলাম কিবরিয়া পিনু
----------------------------------
শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮), তাঁর সঙ্গে আমার একদিনের ঘটনার কথা বলি, তাঁর মৃত্যুর তিন-চার বছর আগের ঘটনা। নয়া পল্টনে তখন আমার অফিস, আমাদের অফিসের এক অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধেয় শওকত ওসমান এসেছিলেন প্রধান অতিথি হিসেবে। অনুষ্ঠান শেষে, অফিসের গাড়িতে, তাঁকে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার ওপর পড়েছিল, আমিও আনন্দচিত্তে তাঁকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করল, আগ বাড়িয়ে আমার নাম বা পরিচয় কিছুটাও উন্মোচন না করে চলছি, অফিসের একজন কর্মকর্তা হিসেবে তাঁকে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। গাড়ি কিছুদূর যাওয়ার পর, তিনি আমার নাম জিগ্যেস করলেন, আমি আমার নামটা বলাতেই, বিদ্যুৎ-স্পর্শের মতো তিনি যেন চমকে গিয়ে বললেন, এতক্ষণও তুমি তোমার নাম বলোনি কেন? আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম, তিনি আমার নাম শুধু জানেন না, আমি যে লেখালেখি করি তারও খবর ভালোমতো রাখেন! আমি চমকে গেলাম, বিষ্ময়াভিভূত হলাম।
বিনীতভাবে বলি, তখন ‘আজকের কাগজ’ সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত দৈনিক, তাতে আমি নিয়মিত কবিতা ও কলাম লিখতাম, শ্রদ্ধেয় শওকত ওসমানও তখন আজকের কাগজে কলাম ও অন্যান্য লেখা তো লিখতেনই, তার পরও ‘শেখের সম্বরা’ নামে তাঁর ছড়া ছাপা হতো প্রায় প্রতিদিন সেই সময়। তিনি একজন সিনিয়র ও প্রখ্যাত লেখক হওয়ার পরও, সেই সময়ে আমাদের মতো লেখক ও লেখার খোঁজ-খবর রাখতেন, তা সে-সময়ে আমার ইন্দ্রিয়গোচরও হওয়ায় বিস্ময়ঘোরে পড়েছিলাম, সেই ঘটনার স্মৃতি এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে বেশ!
গাড়ি চলতে লাগল, শান্তিনগরের বাজারে গাড়ি পৌঁছালে, গাড়ি থামাতে বললেন, ড্রাইভার গাড়ি থামালেন, তিনি গাড়ি থেকে নেমে ফলের দোকান থেকে কিছু ফল কিনলেন। অতঃপর গাড়িতে উঠে আবার আমরা চললাম, এরমাঝে তিনি কথা বললেন, আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে শুনলাম।্
রাজারবাগের পাশেই তাঁর বাড়ি! তাঁকে তাঁর বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে, আমি চলে আসতে চাইলাম। না, তা আর হলো না! তিনি তাঁর বাড়ির ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। আমার জন্য কল্পনার বাইরে ছিল, শান্তিনগর বাজার থেকে যে ফল কিনেছিলেন, তা আমার জন্যই কিনে এনেছিলেন, তা বুঝতে পারিনি, আমি ভেবেছিলাম তাঁর জন্য বা বাসার জন্য কিনেছেন। সেই ফল নিজের হাতে কেটে এনে আমাকে খাওয়ালেন! এমন ভালোবাসাময় আতিথেয়তা পেয়ে সেদিন যেন আমি এক অনতিদূরের নিকটবর্তী মানুষ ও লেখকের পরিচয় পেয়েছিলাম, তা ভুলতে পারিনি। এর পর, তিনি আমাকে তাঁর একটি বই উপহার দিলেন, না জিগ্যেস করেই, আমার নাম শুদ্ধ করে লিখে, ছড়ার আঙ্গিকে দুই পঙক্তি লিখে উপহার দিলেন। এই যে তাৎক্ষণিক সংশ্লেষ ও সংস্পর্শ, তা তাঁর ভালোবাসার অন্তঃশীলা থেকে সেদিন আমার মতো একজনের জন্য উৎসারিত হয়েছিল, তা আমি সেদিন অলোকসামন্যতা নিয়ে বুঝেছিলাম, তা এখনো অনুভব করি! তাঁর সেই নৈকট্য আমার স্মৃতিতে সিলমোহর নিয়ে স্থায়ী হয়ে আছে, যা এখনো অনুরণিত হয়!
রিপোর্টার্স২৪/এসসি