আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি: ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর আর্থিক শক্তির উৎস অবরুদ্ধ করার লক্ষ্যে রাশিয়া ও ইরান থেকে জ্বালানি আমদানিকারী দেশগুলোর ওপর কঠোর অবস্থান নিল মার্কিন সিনেট।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) মার্কিন সিনেটে ৮৬-১১ ভোটে একটি নতুন বিল পাস হয়েছে, যার অধীনে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস কেনার অপরাধে ভারত ও চীনসহ পাঁচটি দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই বিলটির নাম রাখা হয়েছে 'লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬'।
কিয়েভ সফরের পর গত ১১ জুলাই প্রয়াত হওয়া রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ও তাঁর উদ্যোগকে সম্মান জানিয়ে বিলটির এই নামকরণ করা হয়েছে। নতুন এই আইন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্বকীয় ক্ষমতার ভিত্তিতে রাশিয়ার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি তেল ও গ্যাস আমদানিকারী প্রধান পাঁচ দেশ—চীন, ভারত, আজারবাইজান, হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ার ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক আরোপের অধিকার দেবে।
এছাড়া, এই বিলে ইরানের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলোকে শাস্তির আওতায় আনতে ১৯৯৬ সালের 'ইরান স্যাংশনস অ্যাক্ট'-এর মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ক্রেমলিন ঘনিষ্ঠ মুষ্টিমেয় ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, শীর্ষ কর্মকর্তা এবং ক্রেমলিন সংলগ্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তবে এই বিল পাস হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্ক কার্যকর হবে না। এটি চূড়ান্ত আইনে পরিণত হওয়ার পর শুল্ক বসানো বা প্রয়োগ করার মূল স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপরই ন্যস্ত থাকবে, যা বিলের চূড়ান্ত খসড়া ও প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
ভারতের জন্য এই বিলটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চীন বিশ্বজুড়ে রাশিয়ান অপরিশোধিত তেলের একক বৃহত্তম ক্রেতা হওয়ার পর দ্বিতীয় স্থানেই রয়েছে ভারত। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভারতের কিছু পণ্যের ওপর ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপানো রয়েছে, তার ওপর অতিরিক্ত এই ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি মার্কিন বাজারে ভারতীয় রপ্তানি বাণিজ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সেই সময় থেকে ভারত সস্তায় রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়িয়ে দেয়, যা দেশের শোধনাগারগুলোর খরচ কমাতে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালী ঘিরে সংকট তৈরির পর সেই নির্ভরতা আরও বেড়ে যায়।
এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ওয়াশিংটন ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল, যার ফলে কিছু রপ্তানি দ্রব্যে মোট শুল্কের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ শতাংশ। তবে শুল্ক বাড়লেও ভারতের আমদানি কমেনি; বরং ২০২৬ সালের জুন মাসেই ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানি একলাফে ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে নতুন রেকর্ড গড়ে। নয়াদিল্লি অবশ্য শুরু থেকেই স্পষ্টভাবে জানিয়ে আসছে যে, তাদের জ্বালানি ক্রয় সম্পূর্ণভাবে জাতীয় স্বার্থ ও দেশের শক্তি সুরক্ষার নীতি দ্বারা পরিচালিত। বিলটির প্রক্রিয়া আরও এগোলে ভারত আবার তাদের এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিনেটে অনুমোদিত হওয়ার পর বিলটি এখন মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে (প্রতিনিধি পরিষদ) পাঠানো হয়েছে, যা আগামী ৩১ আগস্ট পুনরায় বসবে। প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হওয়ার পরই তা চূড়ান্ত সাক্ষরের জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে যাবে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব