আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে নিজেদের সাফল্যের দাবি অব্যাহত থাকলেও ইসরায়েলের গণমাধ্যমে এখন ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। দেশটির অজেয় ভাবমূর্তিতে প্রথমবারের মতো ফাটল ধরার ইঙ্গিত মিলছে, আর ক্রমেই সামনে আসছে পরাজয়ের বয়ান।
ইসরায়েলের দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনথ-এ ২৫ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইয়োসি ইয়েহোশুয়া প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার মধ্যে উত্তেজনার কথা তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় দুই শীর্ষ কর্মকর্তার মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। এর তিন দিন আগে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, জানুয়ারিতে বার্নিয়া মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে এমন একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন, যেখানে নেতৃত্বহীনতা তৈরি হলে সফল অভ্যুত্থান ঘটানোর কথা ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া মোসাদপ্রধান এমন বার্তা ওয়াশিংটনে নিতেন না।
ইসরায়েলের সেনাপ্রধান আইয়াল জামির নিরাপত্তা মন্ত্রিসভাকে সতর্ক করেছেন, জনবল সংকটের কারণে সামরিক বাহিনী ভেতর থেকে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যুদ্ধ চলাকালীন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের মধ্যে দোষারোপের রাজনীতি চলায় দেশটির মধ্যে অস্বস্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুতে ইসরায়েলে উল্লাসের আবহ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অভূতপূর্ব’ সমন্বয় নিয়ে শীর্ষ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। তবে যৌথ হামলার পর ইরানের পাল্টা প্রতিরোধে দিমোনা পারমাণবিক চুল্লি, হাইফা তেল শোধনাগার ও বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরসহ কয়েকটি কৌশলগত স্থাপনায় আঘাত হানা গেছে। গত চার সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলি নাগরিকরা বোমা আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ কক্ষে ছুটে চলেছেন। অর্থনীতি চাপে, স্কুল ও ব্যবসা বন্ধ রয়েছে, যদিও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি দেশ।
জনমত এখনও যুদ্ধের পক্ষে, কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে ইসরায়েলের লক্ষ্যগুলো কি অচল হয়ে যাচ্ছে? ইরানের ‘মোজাইক’ কৌশল দেশের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর সামরিক প্রতিরোধ লেবাননের উত্তরে পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।
লেবাননে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, সেতু ধ্বংস এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে, কিন্তু কোনো স্পষ্ট সমাধান নেই। গাজাতেও সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে, হামাস এখনো টিকে আছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও আইসিজে মামলার মুখোমুখি হয়েছেন নেতানিয়াহু।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মূল সমস্যা হলো ইসরায়েলের এককভাবে সামরিক সমাধানের ওপর নির্ভরতা, রাজনৈতিক রূপরেখার অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। নেতানিয়াহুর ‘সম্পূর্ণ বিজয়’-এর বক্তব্য দেশটিতে দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ধর্মীয় কট্টরপন্থী ও জাতীয়তাবাদী প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে, সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপর্যায়ে ধর্মীয় বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীর প্রভাবও বাড়ছে।
‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রকল্প জাতীয় নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে, যেখানে ফিলিস্তিনি জাতীয় সত্তাকে দমন এবং মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে ইরান যুদ্ধের সমাধিতে সবচেয়ে বড় বাধা ইসরায়েলই হয়ে উঠছে। দেশটি যুদ্ধ উত্তেজনা বাড়াতে, সমঝোতা ও যুদ্ধবিরতি উদ্যোগকে দুর্বল করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে স্থল অভিযান করার পথে প্ররোচিত করতে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের উল্টোপাল্টা বক্তব্য শক্তির প্রতীক নয়, বরং অনিশ্চয়তার বার্তা দিচ্ছে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সামর্থ্য অতিরিক্ত মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, ইরানকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নও উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যুদ্ধ ছেড়ে চলে যেতে পারে, তখন ইসরায়েল একা পড়ে যাবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উচ্চাভিলাষী এই পথ অনুসরণে ইসরায়েল বড় ধসের দিকে এগোচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি সূত্র: আল জাজিরা