আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকির সময়সীমা আবারও বাড়িয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার যে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, তা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত।
এর আগে তেহরান ১৫ দফা মার্কিন প্রস্তাবকে “অন্যায্য” বলে প্রত্যাখ্যান করে। চার সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু করে। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে ট্রাম্প ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে—যার মেয়াদ শেষ হবে ৬ এপ্রিল রাত ৮টা (ইস্টার্ন টাইম)।
ট্রাম্প দাবি করেন, আলোচনা চলছে এবং তা খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে।
তবে ইরান বলছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা চলছে না। এছাড়া যুদ্ধের কারণে দেশটির অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হওয়ায়, যুক্তরাষ্ট্র কার সঙ্গে আলোচনা করছে সেটিও স্পষ্ট নয়।
এর আগে ২৩ মার্চ ট্রাম্প পাঁচ দিনের জন্য হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা এখন বাড়িয়ে ১০ দিনে নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরান সাত দিনের বিরতির অনুরোধ করেছিল। যদিও এ বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হবে। ইতোমধ্যে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যার মাধ্যমে বিশ্বে প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরান, কুম ও উরমিয়া শহরে আবাসিক এলাকায় হামলার খবর জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম। কুমের পারদিসান এলাকায় অন্তত তিনটি বাড়িতে হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। তেহরানে ধ্বংসস্তূপ থেকে একজনকে জীবিত উদ্ধার করেছে রেড ক্রিসেন্ট। উরমিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বহু হতাহত ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের বিভিন্ন স্থানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যার উদ্দেশ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা।
চলমান সংঘাতে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে, তরলীকৃত গ্যাসের দামও ঊর্ধ্বমুখী। খাদ্য উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নাইট্রোজেনভিত্তিক সার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শেয়ারবাজারে পতনের পর এশিয়ার বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে এবং অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
এদিকে পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো ১৫ দফা মার্কিন প্রস্তাবটি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যালোচনা করে দেখেছে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় তৈরি বলে তারা মনে করছে। তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেও ইরানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
প্রস্তাবনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম সীমিত করা এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার মতো শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের নিয়ে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করতে বহুজাতিক নৌ টাস্কফোর্স গঠনের চিন্তাভাবনা করছে। তবে কয়েকটি মিত্র দেশ এতে তাৎক্ষণিকভাবে অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো সংঘাতে মানববিহীন ড্রোন স্পিডবোট ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি