রিপোর্টার্স২৪ডেস্ক: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবে ওই সময়ের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিষয় তুলে ধরে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
গত শুক্রবার (২০ মার্চ) প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। পরে এটি পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
(প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যানছবি: গ্রেগ ল্যান্ডসম্যানের দপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে)
প্রস্তাবে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। সে সময় পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ছিল এবং বাঙালিদের প্রতি বৈরী মনোভাব বিদ্যমান ছিল বলেও এতে বলা হয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে এবং বেসামরিক জনগণের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া দুই লাখের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন।
সে সময় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে পাঠানো একাধিক বার্তায় ঘটনাগুলোকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত ওই প্রতিবাদলিপিতে যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতার সমালোচনা করা হয়।
প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়, সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর প্রতিবেদনে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। একইসঙ্গে মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডি ১৯৭১ সালে দেওয়া এক প্রতিবেদনে পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত সহিংসতাকে সুপরিকল্পিত গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেন।
জাতিসংঘের গণহত্যা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো জাতি, গোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে,যা ১৯৭১ সালের ঘটনাবলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রস্তাবে দাবি করা হয়।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা জাতিগত বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা, রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে হত্যা এবং নারীদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার মতো অপরাধে জড়িত ছিল। বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ ও জোরপূর্বক বিতাড়নের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের কর্মকাণ্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে।
এতে আরও বলা হয়, ইতিহাসের এমন নৃশংস ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ ও স্মরণ করা জরুরি, যাতে ভুক্তভোগীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো যায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। সূত্র: প্রথম আলো
রিপোর্টার্স২৪/এসসি