আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারানোর শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ(সিপিডি)। একই সঙ্গে এ চুক্তির ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)–এর আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে সূচনা বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
মূল প্রবন্ধে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ চুক্তির আওতায় দেশটিকে প্রায় সাড়ে চার হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। এছাড়া আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হবে। এর ফলে সরকার বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার শুল্ক রাজস্ব হারাতে পারে।
তিনি বলেন, চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা ডব্লিউটিওর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এতে সংস্থাটির অন্যান্য সদস্য দেশকেও একই সুবিধা দিতে বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে, যা ডব্লিউটিও ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। এ কারণে চুক্তির বিষয়বস্তু উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তাদের যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে উৎসাহিত করতে হয়, তাহলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। তা না হলে কেন তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পণ্য আমদানি করবে—সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সরকার কর কমিয়ে স্থানীয় বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়। বর্তমানে দেশে ডিজেল, অকটেনসহ কয়েক সপ্তাহের জ্বালানি মজুত রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো স্থায়ী কৌশলগত জ্বালানি মজুতের অভাব।
তিনি জানান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস থেকেও তেল আমদানির সুযোগ রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
ব্রিফিংয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের ভেতরে ও বাইরে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে এখন নীতিনির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এজন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২.৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ। ইতোমধ্যে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে অতিরিক্ত সরকারি ঋণের কারণে ব্যাংকিং খাতে চাপ বাড়ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন সিপিডির এই নির্বাহী পরিচালক।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি