রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: ইতালি গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্নে বাড়ি ছেড়েছিলেন সুনামগঞ্জের কয়েকজন তরুণ। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার পথে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে একটি মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন অন্তত ১২ জন বাংলাদেশি যুবক। তাদের ওপর চালানো হচ্ছে ভয়াবহ নির্যাতন, আর সেই দৃশ্য ভিডিও কলে দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার একই গ্রামের ১১ জনসহ মোট ১৩ জন তরুণ অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালালচক্রের সঙ্গে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকায় চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু ইতালি পৌঁছানো তো দূরের কথা, তারা এখন লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের হাতে বন্দি হয়ে আছেন।
১৩ জনের মধ্যে একজন বর্তমানে লিবিয়ার পুলিশের হাতে আটক রয়েছেন। বাকি ১২ জন গত প্রায় ১২ দিন ধরে ত্রিপোলির একটি স্থানে আটকে আছেন বলে জানা গেছে। জিম্মিকারীরা তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলে সেই দৃশ্য দেখিয়ে প্রতিজনের পরিবারের কাছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করছে।
পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, জিম্মিকারীরা বাংলা ভাষাভাষী লোকদের দিয়েই ফোনে কথা বলাচ্ছে এবং বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বলছে। জিম্মি থাকা ১২ জনের মধ্যে ১০ জনের বাড়ি জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামে।
জিম্মি থাকা যুবকদের মধ্যে রয়েছেন, নুরু মিয়ার ছেলে জীবন মিয়া (২৫), টুনু মিয়ার ছেলে আব্দুল কাইয়ুম (২৬), ফয়জুন নুরের ছেলে মনিরুল ইসলাম (২৪), শহীদ মিয়ার ছেলে মামুন মিয়া (২৭), রাশিদ মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৮), বাচ্ছু মিয়ার ছেলে এনামুল হক (২৬), জলিল মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৯), এখলাছ মিয়ার ছেলে আমিনুল ইসলাম (২৫), রাশিদ আলীর ছেলে সফিকুল ইসলাম (৩২) এবং আবুল কাশেমের ছেলে নিলয় মিয়া (২২)।
এদের মধ্যে নুরু মিয়ার বড় ছেলে ইয়াছিন মিয়া (৩০) বর্তমানে লিবিয়ার পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। এছাড়া জামালগঞ্জ উপজেলার তেলিয়াপাড়া এলাকার আবুল হামজা ও সাচনা গ্রামের আবুল কালাম এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া গ্রামের সোহেল মিয়াও একই দলের সঙ্গে বিদেশ যাওয়ার পথে জিম্মি হয়েছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নাজিমনগর গ্রামের শহীদ মিয়ার স্ত্রী দিলোয়ারা বেগম, তার ছেলে হুমায়ুন কবির এবং জামাতা নজরুল ইসলামের সঙ্গে বিদেশ পাঠানোর জন্য মৌখিক চুক্তি হয়েছিল। প্রতিজনের কাছ থেকে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা নেওয়ার পরও তাদের ইতালি পৌঁছানোর কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জানুয়ারি ওই যুবকেরা বাড়ি থেকে রওনা দেন। প্রথমে তাদের সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে কুয়েত, কুয়েত থেকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছানো হয়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সাগরপথে ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালি পাঠানোর প্রস্তুতির সময়ই একটি চক্র তাদের জিম্মি করে।
এরপর থেকেই শুরু হয় নির্যাতন ও মুক্তিপণের দাবি। প্রায় প্রতিদিনই পরিবারের সদস্যদের মোবাইলে ভিডিও কল করে মারধরের দৃশ্য দেখানো হচ্ছে এবং দ্রুত টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। অনেক অনুরোধের পর জিম্মিকারীরা জানিয়েছে, প্রতিজন ১২ লাখ টাকা দিলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
পরিবারের দাবি, এই ঘটনার পেছনে দালালচক্রের একাধিক সদস্য জড়িত থাকতে পারে। এক পরিবারের সদস্য ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে কিছু টাকা পাঠানোর পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, দেওয়া ব্যাংক হিসাবটি কিশোরগঞ্জ জেলার একটি অ্যাকাউন্ট। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পরিবারের লোকজন সেখানে গিয়েও অনুসন্ধান করেছেন।
জিম্মি সফিকুল ইসলামের বাবা বৃদ্ধ রাশিদ আলী বলেন, দ্বিতীয় রোজার দিন ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি বলেন, “জমি-জমা বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠাইছিলাম। এখন আবার টাকা চাইতেছে। আমি অসুস্থ মানুষ, এত টাকা কোথায় পাব?”
জীবন মিয়ার বাবা নুরু মিয়া বলেন, গ্রামের কয়েকজনকে বিশ্বাস করেই তারা টাকা দিয়েছিলেন। এখন সেই লোকদেরও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার আশঙ্কা, দালালদের মধ্যে টাকা নিয়ে বিরোধের কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে জিম্মি আতাউর রহমানের বড় ভাই হারুন মিয়া জানান, অনেক কষ্ট করে টাকা জোগাড় করে বিদেশ পাঠানো হয়েছিল। এখন আবার মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে পরিবারগুলো গরু, জমি বিক্রি করছে এবং ঋণ নিচ্ছে।
ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য একরাম হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, একই গ্রামের এতগুলো মানুষ একসঙ্গে জিম্মি হওয়ায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও কান্নার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তার নিজের আত্মীয়রাও এই তালিকায় রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দিলোয়ারা বেগম প্রথমে বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তারা কাউকে বিদেশে পাঠাননি এবং তার পরিবারের সদস্যরাও জিম্মি রয়েছেন।
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বন্দে আলী বলেন, এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। কেউ অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুশফিকুন নুর বলেন, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি দেখেছেন। কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে জানালে খোঁজখবর নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার চেষ্টা করা হবে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম