| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

রয়টার্স প্রতিবেদন

ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনে চীনের প্রভাব বাড়ছে

reporter
  • আপডেট টাইম: ফেব্রুয়ারী ১০, ২০২৬ ইং | ১২:৪১:২৯:অপরাহ্ন  |  ৭৬২৩০৪ বার পঠিত
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনে চীনের প্রভাব বাড়ছে
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতঘনিষ্ঠ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশে চীনের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহের জাতীয় নির্বাচনের পর এই প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনীতিক ও বিশ্লেষকেরা। তবে তাঁদের মতে, আকার ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে ভারতকে পুরোপুরি পাশ কাটানো বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে এগিয়ে থাকা দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেনি। টানা ১৫ বছর (২০০৯–২০২৪) ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ, আর তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনে ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করছেন।

শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক দৃশ্যমানভাবে অবনতির দিকে গেলেও এই সময়ে চীন ঢাকায় বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় একটি ড্রোন কারখানা স্থাপনে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে বেইজিং।

চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। চীনা দূতাবাসের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, এসব বৈঠকে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের অবকাঠামো প্রকল্পসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন,বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, শেখ হাসিনার অপরাধে ভারত সহযোগী ছিল।

তিনি আরও বলেন,যে দেশ একজন সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দিয়ে আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ দিচ্ছে, তার সঙ্গে সম্পর্ক বা ব্যবসা গড়ে তোলাকে মানুষ মেনে নেবে না।তবে তারেক রহমান তুলনামূলক সংযত বক্তব্য দিয়ে রয়টার্সকে বলেন,আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। তবে সবার আগে আমাদের জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।

ক্রিকেটেও কূটনৈতিক উত্তেজনা

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের অবনতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ক্রিকেট অঙ্গনেও। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগের পর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর চাপের মুখে এক বাংলাদেশি তারকা বোলারকে আইপিএল দল থেকে বাদ দেওয়া হয়।

এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ মার্চ–মে মাসে অনুষ্ঠেয় আইপিএলের সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি–মার্চে অনুষ্ঠিতব্য পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরানোর অনুরোধ জানানো হয়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ দেওয়া হয়।

দুই দেশই একে অপরের নাগরিকদের জন্য ভিসা সীমিত করেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকাশ্য বৈঠকও খুব কম হয়েছে। তবে গত ডিসেম্বর ঢাকায় এসে তারেক রহমানের মায়ের মৃত্যুতে সমবেদনা জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। গত বছর ঢাকার একটি আদালত জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং হাজারো আহত হন। যদিও শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন

নির্বাচনের আগে বিএনপি ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বিদেশি শক্তির ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। জামায়াত অভিযোগ করছে বিএনপি ভারতের খুব কাছাকাছি, আর বিএনপি বলছে, জামায়াতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে।

এক সমাবেশে তারেক রহমান বলেন,‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, বাংলাদেশই সবার আগে।’

ভারতের কর্মকর্তারা বেসরকারিভাবে স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকায় নতুন সরকার যেই হোক, তার সঙ্গে কাজ করতেই হবে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

চীন এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার ৯৫ শতাংশই বাংলাদেশে চীনা পণ্য আমদানি। শেখ হাসিনার পতনের পর চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেস-এর সিনিয়র ফেলো কনস্টান্টিনো জাভিয়ের বলেন,ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকটকে কাজে লাগিয়ে চীন প্রকাশ্যে ও আড়ালে ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়াচ্ছে।

তিনি আরও বলেন,যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া এবং ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে চীন নিজেকে আরও নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেছে।

তবু ভারতকে বাদ দেওয়া নয়

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলেও ভারতকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন,বাংলাদেশের প্রয়োজন চীন ও ভারত দুটোই। বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো সরকারই ভারতকে উপেক্ষা করবে না।

ভারত তিন দিক থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে এবং বাণিজ্য, ট্রানজিট ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীল বাংলাদেশের প্রয়োজন ভারতেরও।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। আদানি গ্রুপ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়েছে, যদিও হাসিনার সময়ে করা চুক্তির উচ্চ শুল্ক নিয়ে ঢাকার আপত্তি রয়েছে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা থাকলেও পানিবণ্টন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং শেখ হাসিনার অজনপ্রিয় শাসনকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের ক্ষোভ তৈরি করেছে।

জামায়াতঘেঁষা তরুণদের দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) নেতারা ভারতের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। দলটির প্রধান নাহিদ ইসলাম বলেন,এটা শুধু নির্বাচনী বক্তব্য নয়। তরুণদের মধ্যে ভারতের আধিপত্যবোধ গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে, আর সেটাই এই নির্বাচনের অন্যতম বড় ইস্যু।

রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪