সাভার প্রতিনিধি: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ঘোষিত ছুটিকে কেন্দ্র করে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে। তবে পর্যাপ্ত বাস না থাকা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো যাত্রী। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নারী, শিশু ও স্বল্প আয়ের মানুষ।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সাভারের আশুলিয়ার বাইপাইল, জামগড়া, পল্লী বিদ্যুৎ, নবীনগর, সাভার বাসস্ট্যান্ড, কালামপুর, ঢুলিভিটা, আমিনবাজার ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ঘরমুখো যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। অনেক যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাস না পেয়ে সড়কের পাশে বসে থাকতে বাধ্য হন।
বাইপাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কোলে ১৬ মাস বয়সী শিশু সন্তান নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় সুলতানা নাসরিনকে। তিনি যাচ্ছেন বগুড়ায়। সুলতানা বলেন, প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি। কোনো বাস পেলেই দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। শিশুকে কোলে নিয়ে রাস্তায় বসে থাকতে থাকতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। ভোট উপলক্ষে পাওয়া চার দিনের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যেতে এসে এমন দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন বলে জানান তিনি।
সরকার নির্বাহী আদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য ১০ ফেব্রুয়ারি বিশেষ ছুটি বহাল রাখা হয়েছে। এ কারণে বিকাল থেকেই সাভার, আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল এবং পার্শ্ববর্তী ধামরাইয়ের বিভিন্ন কারখানা থেকে শ্রমিক ও কর্মচারীদের ঘরমুখো যাত্রা শুরু হয়।
গাইবান্ধাগামী যাত্রী অর্নব আলম স্বামী ও শিশু সন্তান নিয়ে বাসের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বলেন, দেশে তো ভোট দেওয়ার জন্যই যাচ্ছি। কিন্তু এই যে ভোগান্তি—কেউ দেখার নেই। ছুটি পেলেও এখনো বেতন পাইনি। বিকাশ থেকে টাকা তুলতে পারছি না। বাসের ভাড়া ৫০০ থেকে শুরু করে ৭০০, ১২০০ এমনকি ১৫০০ টাকা পর্যন্ত চাইছে। দুই বাচ্চা নিয়ে রাস্তার মধ্যে বসে আছি, কীভাবে যাব বুঝতে পারছি না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী হাসান আলী বলেন, টিভিতে বলা হচ্ছে নিরাপদে যাতায়াত করা যাবে, ভাড়া বেশি নেওয়া হবে না। বাস্তবে দেখি পুলিশ নেই, প্রশাসনের কাউকেও চোখে পড়ছে না। বাস কম, ভাড়া বেশি—সব মিলিয়ে মানুষ বিপাকে।
গাজীপুরে নিজ বাড়ি যাওয়ার পথে পোশাকশ্রমিক নাসরিন আলম, তিন দিনের ছুটি পেয়েছি—এর মধ্যেই বাড়ি যাওয়া-আসা করতে হবে। অটো দিয়ে অনেক দূর এসে দেখি বাসই নেই। ভোট দেওয়ার আগ্রহ আছে, কিন্তু এই অবস্থায় যাত্রা করাই কষ্টকর।
আরেক যাত্রী জুবায়ের আলম জানান, তিনি পরিবার নিয়ে কুড়িগ্রাম যাচ্ছেন। প্রায় ২০ মাইল অটোতে করে এসে কোনো কাউন্টারেই সিট পাননি। তিনি বলেন, ভাড়া ১০০০ টাকার নিচে কেউ কথা বলছে না। বিকাশ, রকেট, নগদ—সব ক্যাশ আউট বন্ধ। টাকা আছে, কিন্তু ব্যবহার করতে পারছি না। প্রশাসনের কোনো তদারকি নেই।
অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, নির্বাচন উপলক্ষে সরকারিভাবে বাড়তি বাস ও ভাড়া নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। ফলে ভোট দিতে আগ্রহী মানুষকেই চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাভার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ শাজাহান বলেন, সড়কে বড় ধরনের যানজট নেই, তবে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে কিছুটা ধীরগতি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
তবে যাত্রীদের দাবি, শুধু ধীরগতির কথা বললে হবে না—বাড়তি বাসের ব্যবস্থা, ভাড়া তদারকি এবং মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের উপস্থিতি নিশ্চিত না করলে এই দুর্ভোগ কমবে না। ভোট ও ছুটিকে কেন্দ্র করে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি