স্টাফ রিপোর্টার: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দুই রাজনৈতিক দলের ইশতেহারকে বাস্তবতা বিবর্জিত ও অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংস্থাটি বলেছে, জামায়াত ও বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নযোগ্য করতে হলে সবার আগে সুশাসন নিশ্চিত, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। অন্যথায় এসব প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে সুজন আয়োজিত ‘কোন দলের কেমন ইশতেহার?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে ইশতেহারগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলা হয়, প্রায় সব রাজনৈতিক দল উন্নয়নের কথা বললেও তাদের পথ ও দর্শনে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিএনপি বাজারভিত্তিক অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভবিষ্যতমুখী ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি, যুব কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ ও ডিজিটাল শিল্পকে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে। সিপিবি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সমাজতান্ত্রিক পুনর্বণ্টনের কথা বলেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাকে ধর্মীয় নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। আর জামায়াতে ইসলামী উচ্চ প্রবৃদ্ধির আধুনিক কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সুজন মনে করে, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও আয়-বৈষম্য ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু অধিকাংশ দলের ইশতেহারে এসব সমস্যার টেকসই সমাধানের রূপরেখা স্পষ্ট নয়।
পররাষ্ট্রনীতি ও ভূরাজনীতির প্রশ্নে সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়, বিএনপি সার্বভৌমত্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির কথা বলেছে। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন মুসলিম বিশ্বকেন্দ্রিক সংহতির ওপর জোর দিয়েছে। এনসিপি বাস্তববাদী ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক অবস্থান নিয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে ইশতেহারগুলোতে জিও-পলিটিক্স ও আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
আর্থিক দিক থেকে সব দলের ইশতেহারের বড় দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কত টাকা লাগবে এবং সেই অর্থের উৎস কী তার সুস্পষ্ট হিসাব নেই। ফলে নাগরিকদের মধ্যে এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
জামায়াতের ইশতেহার প্রসঙ্গে সুজন বলেছে, তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য দুর্নীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, করের আওতা সম্প্রসারণ, সরকারি নিয়োগ ও ক্রয়ে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমানো জরুরি। এসব সংস্কার ছাড়া কর কমিয়ে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়।
বিএনপির ইশতেহারের কয়েকটি বড় প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। এর মধ্যে রয়েছে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ২০৩৫ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা, চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ। এসব পরিকল্পনাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল উল্লেখ করে সুজন বলেছে, কৃষক কার্ডের ভর্তুকির পরিমাণও স্পষ্ট নয়, ফলে প্রকৃত রাজস্ব ব্যয় নির্ধারণ করা কঠিন।
এ ছাড়া ধনীদের করের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সুজন বলেছে, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি ও নীতিগত দিকনির্দেশ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কোন দলের দর্শন বাস্তবে রূপ পাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি