টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সাগরদীঘি বিনোদন কেন্দ্র এখন অযত্ন-অবহেলায় জৌলুশ হারাচ্ছে। একসময় স্থানীয় মানুষের বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল এই কেন্দ্র। শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিনোদন ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অবসর কাটানোর উপযোগী স্থান হিসেবে পরিচিতি পেলেও বর্তমানে সেখানে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি কমেছে। অভিযোগ উঠেছে, কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে বিনোদন কেন্দ্রটি মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডাস্থলে পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল, ঐতিহ্যবাহী সাগরদীঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বিনোদন কেন্দ্রটি এলাকার মানুষের আনন্দ-বিনোদনের পাশাপাশি শিশুদের মানসিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও তদারকির অভাবে সেই প্রত্যাশা এখন অনেকটাই ম্লান।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পুরোনো ডাকবাংলোকে কেন্দ্র করে দিঘির পাড়ে নির্মাণ করা হয় দৃষ্টিনন্দন এই বিনোদন কেন্দ্র। নির্মাণের পর এটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। উদ্বোধনের পর দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে সম্প্রতি কেন্দ্রটিতে মাদকসেবীদের আনাগোনা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে অনেক দর্শনার্থী সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকছেন। ইতোমধ্যে দিঘিকেন্দ্রিক রেস্ট হাউসটির প্রধান ফটকের স্টিলের নামফলক, তালা ও ব্যানার নষ্ট করে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
পার্ক ও ডাকবাংলোর নির্দিষ্ট স্থানে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিনোদন কেন্দ্রটিতে দর্শনার্থীর উপস্থিতি খুবই কম। কেন্দ্রের এক পাশে স্থানীয় একদল কিশোরকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। অন্যদিকে ডাকবাংলোর পাশে পড়ে রয়েছে এলজিইডির সড়ক নির্মাণকাজে ব্যবহৃত পুরোনো একাধিক রোলার, মালবাহী জাহাজের কনটেইনার এবং জেনারেটরের মতো ভারী যন্ত্রাংশ।
দূরদূরান্ত থেকে ঘুরতে আসা কেউ কেউ এসব পুরোনো যন্ত্রাংশের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। আবার অনেকে স্মৃতির নিদর্শন হিসেবে ঘুরে দেখছেন পুরোনো যন্ত্রপাতি ও লাল দালান। বাবা-মায়ের সঙ্গে আসা শিশুরাও এসব দেখে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করছে।
তবে কেন্দ্রটির সার্বিক পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে দর্শনার্থীদের মধ্যে। একদিকে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও পুরোনো যন্ত্রাংশ দেখার আগ্রহ, অন্যদিকে মাদকসেবী ও বখাটেদের আনাগোনার অভিযোগ সব মিলিয়ে পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে সময় কাটানোর পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পার্কে ঘুরতে আসা এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, অনেক প্রত্যাশা নিয়ে মেয়েকে নিয়ে এই বিনোদন কেন্দ্রে ঘুরতে এসেছিলাম। তবে সুস্থ বিনোদনের পরিবর্তে অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। এখানে বখাটে ও মাদকসেবীদের জন্য পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কোনো পরিবেশ নেই।
সাগরদীঘি কলেজের অধ্যক্ষ মো. নাসির উদ্দিন বলেন, পূর্ব ঘাটাইলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান সাগরদীঘি। এ এলাকার মানুষের জন্য বিনোদন কেন্দ্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখতে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তাই ঘাটাইল উপজেলা প্রশাসনের উচিত পার্কটির প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া এবং কিশোর গ্যাং ও মাদকমুক্ত নির্মল পরিবেশ গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বিনোদন কেন্দ্রটির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত নজরদারি, নিরাপত্তা জোরদার এবং স্থাপনাগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ ও আকর্ষণীয় বিনোদনের ব্যবস্থা করা গেলে কেন্দ্রটিতে দর্শনার্থীদের আগ্রহ আবারও বাড়তে পারে।
সাগরদীঘি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ আশরাফ উদ্দিন খান বলেন, বিনোদন পার্কে মাদক সেবনের কোনো সুযোগ নেই। তবে স্থানীয় মাদকসেবীরা রেস্ট হাউস এলাকার ভেতরে কীভাবে প্রবেশ করছে, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তার এ বক্তব্যের পর স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পার্ক ও রেস্ট হাউস এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি মাদকসেবী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ নূরী তাসমিন উর্মি জানান, সাগরদীঘি বিনোদন কেন্দ্রের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে তিনি ইতোমধ্যে অবগত হয়েছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে পার্কটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের উদ্যোগে সাগরদীঘি বিনোদন কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে। অযত্ন-অবহেলা কাটিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই স্থান আবারও শিশু-কিশোর, পরিবার ও প্রকৃতিপ্রেমীদের নিরাপদ বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম