আমনা এজাজ রাফি:
চরম আবহাওয়ার কারণে ফসল ও গবাদি পশুর ক্ষতি কেবল গ্রামীণ আয়কেই ধ্বংস করে না, বরং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে শহরের দিকে ঠেলে দেয়, যা নগরায়ন, বর্জ্য উৎপাদন এবং এর সাথে সম্পর্কিত পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বন উজাড়, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং দ্রুত শিল্পায়নের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন মানবজাতির জন্য একটি অস্তিত্বের সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। কিন্তু বিশ্বমঞ্চগুলো কি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে? আর মানবজাতি কি বিশ্ব উষ্ণায়নের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পেয়েছে? বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, বায়ুমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান ক্ষতিকর গ্যাসের নির্গমন নির্দেশ করছে যে বিশ্ব উষ্ণায়ন ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। তাপমাত্রার এমন বিপুল বৃদ্ধি পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্বের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত COP30 সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব তুলে ধরা হয়েছিল, কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানি নির্গমন সীমিত করার জন্য কোনো দৃঢ় লক্ষ্য বা প্রয়োগকারী ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়নি। পরবর্তী COP31 সম্মেলন ২০২৬ সালের নভেম্বরে তুরস্কের আন্টালিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা, বন উজাড় রোধ করা এবং সৌর, বায়ুগতি ও জলবিদ্যুতের দিকে ধাবিত হওয়ার মাধ্যমে বিশ্ব উষ্ণায়ন কমানোর লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। তবে এই উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
জলবায়ুর বৈরী পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের প্রতিটি দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে কৃষি ক্ষতি, অভিবাসন সংকট এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির মাত্রা দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বৈশ্বিক প্রভাব সমস্যাটি সমাধানের জন্য একটি যৌথ বা সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরদার করে। অন্যদিকে, কয়েকটি কারণ কার্যকর বৈশ্বিক জলবায়ু শাসনব্যবস্থার পথকে দুর্বল করে তুলছে।
প্রথমত, গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে বৈশ্বিক মাত্রায় মিশে যায়। এর অর্থ হলো, নির্গমনের কারণে হওয়া ক্ষতি কেবল সেটি উৎপাদনকারী দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দ্বিতীয়ত, শিল্প বিপ্লবের পর থেকে উন্নত দেশগুলো কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের সুফল ভোগ করে আসছে, তাই নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে জলবায়ু অর্থায়নে তাদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করা উচিত। তৃতীয়ত, অর্থনীতিকে কার্বনমুক্ত করা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধিতে তেল কোম্পানিগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পাকিস্তান বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে মাত্র ১ শতাংশ অবদান রাখে, তা সত্ত্বেও এটি বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলা থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে ১৩ লক্ষ হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি প্লাবিত হয়, যা চাল, তুলা এবং আখের ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করে। সামগ্রিকভাবে, সারাদেশে ১২৩ কোটি মার্কিন ডলারের কৃষিভিত্তিক ক্ষতি রেকর্ড করা হয়েছে। সিন্ধু প্রদেশে গুড্ডু ও সুক্কুর ব্যারেজে নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে ১,৫০,০০০ মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের কিছু অংশে তীব্র দাবানল ও অতিমাত্রায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ু ও পানিসম্পদের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। ফলে পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নামার পাশাপাশি ফসল দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কারণই মূলত খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে বাড়িয়ে তুলছে। পাকিস্তানের ২৪ কোটি জনসংখ্যা, যা ২.৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার চ্যালেঞ্জকে আরও মারাত্মক করে তুলেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যা ৩০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার এই হুমকি মোকাবেলা করতে হলে পাকিস্তান কে তার কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন করতে হবে। ২০২৫ অর্থবছরে পাকিস্তানের খাদ্য আমদানি বিল ছিল ৮০০ কোটি (৮ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। এই আমদানিনির্ভরতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) বীজের ব্যবহার সহ আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির প্রবর্তন ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। জিএম বীজ খরা-সহনশীল হতে পারে এবং এতে পানিও কম প্রয়োজন হয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত সেচ ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সহায়তা এবং বাজার ব্যবস্থার সহজলভ্যতার সঙ্গে জিএম বীজের ব্যবহার পাকিস্তানের কৃষি ফলন বাড়াতে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
পাকিস্তান পানির সংকটেও ভুগছে, তাই দেশটির নতুন বাঁধ নির্মাণের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। আরও ছোট ছোট বাঁধ নির্মাণ করা গেলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যাবে এবং পরবর্তীকালে শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহার করা যাবে। বন্যা ও অন্যান্য চরম প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় গবাদি পশুর ক্ষয়ক্ষতি গ্রামীণ পরিবারগুলোর জন্য আরেকটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তানে প্রায় ৮০ লক্ষ গ্রামীণ পরিবার জীবিকার জন্য গবাদি পশুর ওপর নির্ভর করে। চরম আবহাওয়ার কারণে গবাদি পশু হারালে পরিবারগুলো তাদের আয়ের প্রধান উৎস থেকে বঞ্চিত হয়। ২০২৫ সালের বন্যায় দেশের ২২,৮০০টি খামার পশু মারা যায়।
চরম প্রাকৃতিক দূর্যোগ কেবল জীবিকাকেই ব্যাহত করে না, বরং মানুষকে বাস্তুচ্যুতও করে। যেসকল মানুষ ফসল চাষ এবং গবাদি পশু পালনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে অপারগ হয়ে পড়ে, তারা উন্নত অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে শহরের দিকে ছুটতে পারে। এ ধরনের গণ-অভিবাসন শহরাঞ্চলগুলোতে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ তৈরি করে। দ্রুত নগরায়নের একটি গুরুতর পরিণতি হলো বর্জ্য উৎপাদন বৃদ্ধি। পাবলিক প্লেস ও নদীতে বর্জ্য জমা হওয়ার কারণে পরিবেশ ও বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত হয়। তাছাড়া বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত পোড়ানো থেকে কার্বন মনোক্সাইড সহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
লেখক :ইসলামাবাদ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (IPRI) একজন রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট