| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

দুর্নীতি: বাংলাদেশের উন্নয়নের এক অদৃশ্য কর

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ০৪, ২০২৬ ইং | ২৩:২৬:৩০:অপরাহ্ন  |  ৪৬০ বার পঠিত
দুর্নীতি: বাংলাদেশের উন্নয়নের এক অদৃশ্য কর

সৈয়দ এরশাদ আহমেদ: 

উন্নয়নকে প্রায়শই মাপার চেষ্টা করা হয় মহাসড়কের দৈর্ঘ্য, মেগা প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, রপ্তানি এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দিয়ে। কিন্তু আরেকটি দিক রয়েছে যা তুলনামূলক অনেক কম গুরুত্ব পায়: তা হলো একজন নাগরিককে তার অধিকার হিসেবে পাওয়ার যোগ্য কোনো সেবা আদায় করতে কতটা অর্থ দিতে হচ্ছে, অপেক্ষা করতে হচ্ছে বা সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

ঠিক এই জায়গাতেই দুর্নীতি কেবল একটি নৈতিক সমস্যা থাকে না, এটি একটি অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়—এবং সম্ভবত উন্নয়নের ওপর সবচেয়ে বড় এক অদৃশ্য কর হয়ে দাঁড়ায়।

কোনো সমাজ রাতারাতি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে না। অন্যায় ও অসৎ আচরণ যখন ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়, তখনই দুর্নীতি জেঁকে বসে। যে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় নকল করে তাকে চালাক হিসেবে প্রশংসা করা হয়; যে কর্মচারী স্বজনপ্রীতি বা সম্পর্কের জোরে পদোন্নতি পায় তাকে প্রভাবশালী বলা হয়; আর যে ব্যবসায়ী অসৎ উপায়ে সম্পদ গড়ে তোলে, তার সাফল্যকে শ্রদ্ধা করা হয়। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি নিয়ম মেনে চলার ওপর জোর দেয়, তাকে প্রায়শই 'অব্যবহারিক' বা অপ্রাপ্তবয়স্ক বিবেচনা করা হয়।

যখন এই ধরনের মনোভাব স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ব্যবসা পরিচালনা করার খরচ বেড়ে যায়।

'ওয়ার্ল্ড ভ্যালুস সার্ভে'-এর তথ্য ব্যবহার করে করা গবেষণায় দেখা গেছে যে সাধারণ নৈতিকতা, সামাজিক বিশ্বাস এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল, সেখানে পারস্পরিক বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এর শিক্ষাটা অনেক বড়: মানুষ যখন প্রতিষ্ঠান ও একে অপরকে বিশ্বাস করে, তখন আর্থিক লেনদেন সহজ হয়; আর যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে পড়ে, তখন ব্যবসা করার খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে।

বাংলাদেশের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক তথ্যপ্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে দুর্নীতি কেবল সাময়িক কোনো ভোগান্তি নয়—এটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার দৈনন্দিন সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এ দেখা গেছে, সেবা নিতে গিয়ে ৮১.৬ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং ৬৩.৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। জরিপকালীন সময়ে মোট ঘুষের আনুমানিক পরিমাণ ছিল ১২৬.৩৩ বিলিয়ন টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৫৮ শতাংশ এবং জিডিপির ০.২৩ শতাংশের সমান। এই জরিপে ১৫,৭১৫টি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার সময়কাল ছিল নভেম্বর ২০২৪ থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত।

মূল পরিসংখ্যানের গভীরে গেলে চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। টিআইবি দেখেছে, যেসব পরিবার ঘুষ দিয়েছে তাদের ৮১.৫ শতাংশই জানিয়েছে যে ঘুষ দেওয়া ছাড়া সেবা পাওয়া সম্ভব ছিল না। অর্ধেকেরও বেশি পরিবার জানত না কীভাবে দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করতে হয়, এবং দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে মাত্র ১০.৩ শতাংশ বাস্তবে অভিযোগ করেছে। যারা অভিযোগ করেনি, তাদের ৬১.৩ শতাংশের মতে—তারা দুর্নীতিকে পুরো সেবা ব্যবস্থারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে এবং অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই বলে বিশ্বাস করে।

এই দুর্নীতির বোঝাও সবার ওপর সমান নয়। টিআইবি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত পাঁচটি খাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলো তাদের বার্ষিক আয়ের গড়ে ৫.১ শতাংশ দুর্নীতির পেছনে ব্যয় করেছে, যেখানে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে তা ৩.২ শতাংশ। ফলে দুর্নীতি এক ধরনের বৈষম্যমূলক করের মতো কাজ করে: পরিবার যত দরিদ্র, তার ওপর অনুপাতিক বোঝার পরিমাণ তত বেশি।

এর অর্থনৈতিক পরিণতি আরও সুদূরপ্রসারী। দুর্নীতি লাইসেন্স, অনুমোদন, জমি, পরিবহন, কাস্টমস ও অন্যান্য সেবা পাওয়ার খরচ ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়। এটি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত করে, বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নষ্ট করে এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তোলে। এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, যখন দেশের প্রয়োজন আরও বেশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্কটিও গভীরভাবে বোঝা দরকার। দুর্নীতি এই দুটির একমাত্র কারণ নয়। খাদ্য ও জ্বালানির দাম, বিনিময় হারের ওঠানামা, মুদ্রানীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটার মতো মূল্যস্ফীতির নানা কারণ রয়েছে। তবুও, অনিয়মিত লেনদেন, কেনাকাটায় অনিয়ম এবং প্রশাসনিক বিলম্ব যখন পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ বাড়িয়ে দেয়, তখন তা মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। একইভাবে, দুর্নীতি সরাসরি বেকারত্ব তৈরি না করলেও এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে এবং দক্ষতার চেয়ে সম্পর্কের জোড়কে অগ্রাধিকার দেয়—যা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে দুর্বল করে দেয়।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এই বিস্তৃত অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি। বিশ্বব্যাংক দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দুর্বল কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে মূল উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো জোরদার করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ আরও কার্যকর হয়। উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুর তাদের 'প্রিভেনশন অব করাপশন অ্যাক্ট' এবং 'করাপ্ট প্র্যাকটিসেস ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো'-এর ওপর নির্ভর করার পাশাপাশি পরিষ্কার কেনাকাটার প্রক্রিয়া, স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকাশ, অডিট এবং সহজ অভিযোগ ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়।

ভারতও আরেকটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ উপস্থাপন করে। তাদের 'তথ্য অধিকার' কাঠামো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে কাজ করছে, আর ই-প্রকিউরমেন্ট (অনলাইন কেনাকাটা) ও সরকারি ই-মার্কেটপ্লেস কেনাকাটা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট করেছে। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া তাদের দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইলেকট্রনিক কেনাকাটা পদ্ধতি চালু করেছে, যেখানে তাদের দুর্নীতি দমন কমিশন সরকারি কেনাকাটাকে দুর্নীতির প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বাংলাদেশের কাছে ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বচ্ছতার হাতিয়ার রয়েছে: তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯। সমস্যাটি কেবল আইনের অভাব নয়; সমস্যাটি হলো নাগরিকরা এটি ব্যবহার করতে জানে কি না এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে তথ্য প্রকাশ করে কি না। তথ্য কমিশন নাগরিকদের তথ্য চাওয়া এবং তথ্য না পেলে অভিযোগ জানানোর সুযোগ দেয়। টিআইবি-র সাম্প্রতিক ফলাফল প্রকাশ করে যে কেন সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।

সুতরাং, দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার কেবল স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

প্রতিটি সরকারি সেবার নির্দিষ্ট ফি, প্রক্রিয়া এবং নিষ্পত্তির সময়সীমা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা উচিত। আবেদনগুলো ডিজিটালি ট্র্যাক করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আইনগতভাবে সম্ভব এমন সব ক্ষেত্রে সরকারি কেনাকাটা, প্রকল্পের খরচ, কার্যাদেশ, চুক্তি প্রদান এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। নাগরিকরা যাতে অনুমোদিত বাজেট, খরচ এবং অর্জিত ফলাফলের তুলনা করতে পারে, সেই সুযোগ থাকা দরকার।

অভিযোগ নিরাময় ব্যবস্থারও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। টিআইবি দেখেছে, দায়ের করা দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগগুলোর ৫১ শতাংশের ক্ষেত্রেই কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ ধরনের অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়।

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য কার্যকর স্বার্থের দ্বন্দ্ব সংক্রান্ত নিয়ম এবং সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করা উচিত, স্বজনপ্রীতি বা প্রভাবকে নয়। দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারী ও অভিযোগকারীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বাংলাদেশ যে এই দিকে এগোতে পারে তার কিছু আশাব্যঞ্জক প্রমাণও রয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংক সরকারি কেনাকাটা, রাজস্ব সংগ্রহ, পরিসংখ্যান, পরিকল্পনা ও আর্থিক তদারকিসহ প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বাড়াতে ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুমোদন করেছে, যেখানে ডিজিটালাইজেশনকে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতি কমানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়েছে।

তবে পরিশেষে, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একাই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। যেসব ব্যবসায়ী ঘুষ দেয়, যেসব নাগরিক বিকল্প থাকা সত্ত্বেও ঘুষ গ্রহণে অংশ নেয় এবং যে সমাজ অবৈধ ও ব্যাখ্যাহীন সম্পদকে উদযাপন করে—তারা সবাই দুর্নীতির এই চক্রকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ ভৌত অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতায় প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। উন্নয়নের পরবর্তী ধাপের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সততা ও সুশাসনের ওপর সমপরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন।

একটি সড়ক হয়তো দুটি শহরকে সংযুক্ত করতে পারে, কিন্তু একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করে। একটি সেতু হয়তো যানবাহন পারাপার করতে পারে, কিন্তু নিয়মভিত্তিক সুশাসনই একটি অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

দুর্নীতির আসল মূল্য কেবল টেবিলের নিচ দিয়ে লেনদেন করা অর্থ নয়। এর আসল মূল্য হলো সেই বিনিয়োগ যা কখনোই আসেনি, সেই ব্যবসা যা কখনোই বাড়েনি, সেই চাকরি যা কখনোই তৈরি হয়নি, সেই সেবা যা দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায়নি এবং সেই সামাজিক বিশ্বাস যা সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা কেবল নীতি-নৈতিকতা রক্ষার বিষয় নয়—এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে রক্ষা করার লড়াই।


লেখক: এফআইসিসিআই (FICCI) এবং আমচ্যাম (AmCham) বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি

ইমেইল: seadac@hotmail.com

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪