স্টাফ রিপোর্টার: চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনও কলঙ্ক ও সহিংসতামুক্ত করা গেল না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স (ইডব্লিউএ)।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি: একটি মূল্যায়ন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করা হয়।
সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট, সরকারের সাবেক সচিব প্রফেসর ড. শরিফুল আলম সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর অ্যালায়েন্সের মূল্যায়ন সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেন।
অ্যালায়েন্সের পক্ষে সারাদেশ থেকে মাঠপর্যায়ে নির্বাচনের আগের দিন, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী দুই দিনে সংঘটিত সহিংস ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রধান রফিকুজ্জামান রুমান।
তিনি জানান, নির্বাচনের দিন ভোটারদের ভোটদানে বাধা প্রদান, নির্বাচনী এজেন্টদের জোরপূর্বক কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, ভোট গণনায় কারচুপি, গুরুতর অনিয়ম এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংস ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ দুই শতাধিক ঘটনার তথ্য তারা সংগ্রহ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অ্যালায়েন্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. হেমায়েত হোসনে ও জেনারেল সেক্রেটারি খোন্দকার জাকারিয়া আহমদসহ অন্যান্য নেতারা।
প্রফেসর ড. শরিফুল আলম বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সারাদেশে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তারা দেখেছেন, নির্বাচন দিনের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সার্বিক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ছিল। ভোটার উপস্থিতিও সন্তোষজনক ছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগের আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
তবে দুপুরের পর বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনও কলঙ্কমুক্ত ও সহিংসতামুক্ত করা গেল না। একাধিক কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বা জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়েছে। ভোট গণনায় দীর্ঘসূত্রতা, ফল ঘোষণা বিলম্ব, ফলাফলের শিটে ঘষামাজার অভিযোগ এবং ভোটার সংখ্যার সঙ্গে ঘোষিত ফলাফলের অসঙ্গতি জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। এসব অনিয়মের স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন একটি ব্যাপক বিষয়। কেবল ভোটগ্রহণই যথেষ্ট নয়। নির্বাচন আয়োজনে শীর্ষ থেকে নিম্নপর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতা এবং সুষ্ঠু ভোট গণনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি শীর্ষ প্রশাসনিক কাঠামো ও ভোট গণনার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সংগঠনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে, যেমন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন সচিবের মতো সংবেদনশীল পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অবিমৃশ্যকারী পদক্ষেপ ছিল। এর ফলে নির্বাচন কমিশন ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের পদায়ন হয়েছে বলে তারা মনে করেন। এ বিষয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে জনপ্রশাসন সচিব পরিবর্তন, বাছাই করে বিভাগীয় কমিশনার নিয়োগ বা বদলি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি অনুবিভাগে দীর্ঘদিন পদায়ন না থাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারীর পদত্যাগ, নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ব্যক্তিদের নিয়োগ এবং কমিশন সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগসহ নানা সিদ্ধান্ত একটি বিশেষ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। আপাতদৃষ্টিতে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে পক্ষপাতমূলক মনোভাব কাজ করেছে বলে তাদের পর্যবেক্ষণ।
তিনি বলেন, নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত জনপ্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা, পুলিশের কয়েকজন সদস্য, কিছু প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এবং আনসার বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা পক্ষপাতমূলক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়েছে।
অ্যালায়েন্সের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ও কার্যক্রমে দ্রুততা থাকলেও পুলিশের ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয় ও দায়সারা। নির্বাচনের আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারীর পদত্যাগ পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার একটি কারণ হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, প্রশাসনিক নেতৃত্ব, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট অংশ আন্তরিক না হলে নির্বাচন আপাতদৃষ্টিতে সুষ্ঠু হলেও সামগ্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ড. শরিফুল আলম জানান, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নেয়। ভোটের দিন ও পরবর্তী দুই দিনে সারাদেশে কমপক্ষে দুই শতাধিক সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ড, শারীরিক হামলা, নারী নির্যাতন, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, জমি দখল ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা রয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রকাশ দেখা গেছে। বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা, মারধর, বাড়িঘর ভাঙচুর, দোকান দখল ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধে নির্বাচন কমিশন কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান, নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সহিংসতায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব