আন্তর্জাতিক ডেস্ক: এপস্টেইন কেলেঙ্কারি ঘিরে রাজনৈতিক চাপ তীব্র হলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকি স্কটল্যান্ডে নিজ দলের শীর্ষ নেতার পক্ষ থেকে সরে দাঁড়ানোর দাবি ওঠার পরও তিনি দায়িত্বে থাকার সংকল্পের কথা জানান। এ অবস্থায় সংকটে থাকা তার দলে টানা দ্বিতীয় একজন শীর্ষ সহকারী পদত্যাগ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে এই সংকট তৈরি হয়েছে। প্রয়াত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় আসার পর স্টারমারের বিচারবুদ্ধি ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সোমবার স্টারমারের ঘনিষ্ঠ সহকারী ও যোগাযোগ প্রধান টিম অ্যালান পদত্যাগ করেন। এর এক দিন আগেই পদ ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী মরগান ম্যাকসুইনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে সরে দাঁড়ান।
এর আগে সোমবার ডাউনিং স্ট্রিটে কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়ে মনোবল চাঙা ও ঐক্যের আহ্বান জানান স্টারমার। তিনি মরগান ম্যাকসুইনিকে ‘বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, লেবার পার্টিকে বদলে দেওয়া এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসের অন্যতম বড় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
স্টারমার বলেন, আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে রাজনীতি ভালো কিছুর শক্তি হতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, সেটাই সম্ভব। আমরা এখান থেকেই এগিয়ে যাব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, দেশ পরিবর্তনের পথে।
তবে স্কটিশ লেবার পার্টির নেতা আনাস সারওয়ার স্কটল্যান্ডে এক সংবাদ সম্মেলনে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে স্কটল্যান্ডে লেবারের সমর্থন কমে গেছে। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে হলেও স্কটল্যান্ডের স্বার্থে আমাকে বলতে হচ্ছে ডাউনিং স্ট্রিটের নেতৃত্ব বদলাতে হবে। এই বিভ্রান্তির অবসান জরুরি, বলেন সারওয়ার।
ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বলেন, স্টারমারের কাছে ব্রিটিশ জনগণের দেওয়া ‘স্পষ্ট পাঁচ বছরের ম্যান্ডেট’ রয়েছে এবং তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেই যাবেন।
রয়টার্স জানায়, এপস্টেইন–সংক্রান্ত সাম্প্রতিক প্রকাশিত নথিতে দেখা যাচ্ছে, প্রয়াত প্রিন্স অ্যান্ড্রু নাকি ব্রিটিশ বাণিজ্যসংক্রান্ত নথি এপস্টেইনের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন।
নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন, বাজারেও প্রতিক্রিয়া
আনাস সারওয়ারের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করা সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ লেবার নেতা হিসেবে তিনি সামনে এলেন। এতে ওয়েস্টমিনস্টারে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে সরকারী ঋণের সুদের হার বেড়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করেন, স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হলে আরও বামঘেঁষা কোনো নেতা দায়িত্ব নিতে পারেন, যিনি ঋণ ও ব্যয় বাড়াতে পারেন। পরে স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরিরা প্রকাশ্যে তার প্রতি সমর্থন জানালে সুদের হার ও ইউরোর বিপরীতে পাউন্ডের মান কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
দুই বছরের কম সময়ের শাসনামলে একের পর এক নীতিগত ইউটার্ন ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে স্টারমারের সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। চারজন যোগাযোগ পরিচালকের বিদায়ের পর সেই সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক লেবার এমপি বলেন, এটা যন্ত্রণাদায়ক। যেন ধীরে ধীরে একটি মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনা দেখছি।
তবে উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি, অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপারসহ শীর্ষ মন্ত্রীরা স্টারমারের পাশে দাঁড়ান। সম্ভাব্য নেতৃত্বপ্রার্থী ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে স্টারমারের প্রতি ‘পূর্ণ সমর্থন’ ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, আমি সহকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের মূল্যবোধে ফিরে আসার আহ্বান জানাই। প্রধানমন্ত্রীকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।
স্টারমার আশা করেছিলেন, ম্যাকসুইনির বিদায়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে পারবেন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলা ও অর্থনীতি চাঙা করার মতো অগ্রাধিকার ইস্যুতে আবার মনোযোগ ফিরিয়ে আনবেন।
এদিকে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক বলেন, স্টারমার তার সরকার চালাতে অক্ষম। স্কাই নিউজকে তিনি বলেন, “তিনি বাতাসে উড়তে থাকা পলিথিন ব্যাগের মতো। যদি তিনি নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারেন, তবে লেবার পার্টির অন্য কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে অথবা নির্বাচন দিতে হবে।
আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন স্টারমার
ম্যান্ডেলসন–সংক্রান্ত নতুন কেলেঙ্কারি শুরু হয়, যখন গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রকাশিত নথিতে এমন ইমেইলের তথ্য আসে, যেখানে আর্থিক সংকটের সময় যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য সম্পদ বিক্রি ও কর পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা এপস্টেইনের কাছে ফাঁস করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ম্যান্ডেলসন এসব অভিযোগে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি এবং মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও সাড়া দেননি। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ‘দাপ্তরিক দায়িত্বে অসদাচরণ’-এর অভিযোগে পুলিশ তদন্ত চলছে।
স্টারমার জানিয়েছেন, তিনি সোমবারই লেবার দলের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন এবং রাষ্ট্রদূত নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করবেন। একই সঙ্গে তিনি ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ‘ধারাবাহিক প্রতারণা’র অভিযোগ তুলে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা হবে। -রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি