আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গাজার রাফাহ সীমান্তপথ পুনরায় খুলে দেওয়ার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধ অবসানের পরিকল্পনা নতুন গতি পেয়েছে। তবে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি; বিশেষ করে হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপে থাকা ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় বড় ধাক্কা খেয়েছে। এসব হামলায় গাজায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। একই সঙ্গে হামাসের যোদ্ধারা অস্ত্র সমর্পণে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামাস অস্ত্র না ছাড়লে আবারও যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল।
নিচে ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার পটভূমি এবং এখনো যেসব বিষয় নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলো তুলে ধরা হলো—
ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা কী?
গত সেপ্টেম্বর মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা সংকট সমাধানে একটি ২০ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এতে প্রথমে যুদ্ধবিরতি এবং পরে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো,হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ করা ও গাজায় তাদের কোনো শাসন ভূমিকা না রাখা, ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে গাজার ব্যাপক পুনর্গঠন।
আন্তর্জাতিক মহলে পরিকল্পনাটি ব্যাপক সমর্থন পেলেও এর সব বিষয়ে এখনো পক্ষগুলোর পূর্ণ ঐকমত্য হয়নি। গত ৯ অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাস প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে যুদ্ধ বন্ধ, গাজায় আটক সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েলের কারাগারে থাকা হাজারো ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি, ইসরায়েলের আংশিক সেনা প্রত্যাহার, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং রাফাহ সীমান্তপথ পুনরায় খোলার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এ ছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুমোদন পায়, যেখানে গাজায় একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি কী?
১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পুরোপুরি সহিংসতা বন্ধ হয়নি। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ওই সময়ের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৮৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এই সময়ে চারজন ইসরায়েলি সেনা হামাসের হামলায় নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েল স্থল অভিযান স্থগিত করলেও এখনো গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল ও মিসর সীমান্তবর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরগুলো, যেখানে অবশিষ্ট ভবনগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফলে গাজার ২০ লাখের বেশি মানুষ এখন উপকূলীয় একটি সংকীর্ণ এলাকায় আটকে পড়েছে। সেখানে হামাস আবারও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ভবন বা অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছে।
এদিকে ইরানের নেতৃত্ব সতর্ক করেছে,যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ওপর হামলা চালায়, তাহলে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তেহরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
ফিলিস্তিনি সংগঠন ও ত্রাণ সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে, চুক্তি অনুযায়ী যে হারে গাজায় ত্রাণ প্রবেশের কথা ছিল, ইসরায়েল তা অনুমোদন দিচ্ছে না। তবে ইসরায়েল দাবি করছে, তারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে।
ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে হামাসবিরোধী সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো ঘাঁটি স্থাপন করেছে। হামাস তাদের ‘জনসমর্থনহীন সহযোগী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা হামাস নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি বাহিনীর আরও প্রত্যাহার ও শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন এসব বিষয়ে উভয় পক্ষের অবস্থান এখনো দূরত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় ধাপে কী হওয়ার কথা?
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নতুন বছরের পর ওয়াশিংটন পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু করে। এর আওতায় গাজা পরিচালনার জন্য ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এই কমিটির ওপর নজরদারি করবে বিদেশি বিশিষ্টজনদের নিয়ে গঠিত একটি ‘বোর্ড অব পিস’, যার নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্প নিজেই। শুরুতে এটি শুধু গাজা যুদ্ধের জন্য প্রস্তাব করা হলেও পরে ট্রাম্প জানিয়েছেন, বোর্ডটি অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংঘাতও দেখভাল করবে।
দ্বিতীয় ধাপের মূল শর্ত হলো, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং গাজা সামরিকীকরণমুক্ত হবে; এর বিনিময়ে ইসরায়েল সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করবে।
কূটনীতিকদের মতে, হামাসের কাছে এখনো শতাধিক রকেট এবং হাজারো হালকা অস্ত্র রয়েছে। সম্প্রতি হামাস অন্যান্য ফিলিস্তিনি দল ও মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে। তবে হামাসের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন বা মধ্যস্থতাকারীরা এখনো তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট নিরস্ত্রীকরণ প্রস্তাব দেয়নি।
ইসরায়েলের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামাস অস্ত্র না ছাড়লে আবারও যুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল এবং বলপ্রয়োগ ছাড়া হামাস নিরস্ত্রীকরণ হবে বলে তারা মনে করেন না।এ ছাড়া হামাস তাদের প্রায় ১০ হাজার পুলিশ সদস্যকে নতুন টেকনোক্র্যাট সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, যা ইসরায়েল দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আর কোন বিষয়গুলো অমীমাংসিত?
গাজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের কথা থাকলেও এর কাঠামো, দায়িত্ব ও ক্ষমতা এখনো নির্ধারিত হয়নি।আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (পিএ) কিছু সংস্কার সম্পন্ন করে ভবিষ্যতে গাজায় ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে সেই সংস্কারের ধরন ও সময়সীমা স্পষ্ট নয়।
গাজার পুনর্গঠনের অর্থায়ন ও তদারকি নিয়েও কোনো চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয়নি। চলতি মাসে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ‘নিউ গাজা’ গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন যেখানে আধুনিক আবাসিক ভবন, ডেটা সেন্টার ও শিল্পাঞ্চলের কম্পিউটার-নির্মিত ছবি প্রকাশ করা হয়।
তবে এই পরিকল্পনায় যুদ্ধের সময় ঘরবাড়ি, ব্যবসা ও জীবিকা হারানো ফিলিস্তিনিদের সম্পত্তির অধিকার, ক্ষতিপূরণ কিংবা পুনর্গঠনকালীন সময়ে তারা কোথায় থাকবে এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
অনেক ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনির ধারণা, ট্রাম্পের পরিকল্পনা কখনোই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে না এবং গাজা সংকট দীর্ঘদিন ‘স্থবির সংঘাত’ হিসেবেই রয়ে যাবে।রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি