আশিস গুপ্ত :
রবিবার লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা শেষ হলো। বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা কে ২ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে পেছনে ফেলে এগিয়ে আছেন দক্ষিণপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারো। বাইরে থেকে দেখলে এটি যেন দুই ব্যক্তির লড়াই—একদিকে ৮০ বছরের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, অন্যদিকে ৪৫ বছরের সিনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারো। কিন্তু নির্বাচনের প্রথম দফার ফল আসলে তার চেয়ে অনেক গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রকাশ। এটি শুধু লুলা বনাম বোলসোনারো পরিবারের সংঘর্ষ নয়; এর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিলের শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য, রাষ্ট্রের ভূমিকা, কর্পোরেট পুঁজির ক্ষমতা, অপরাধ ও নিরাপত্তা নিয়ে জন অসন্তোষ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং লাতিন আমেরিকায় দক্ষিণপন্থী রাজনীতির পুনরুত্থানের প্রশ্ন।৪ অক্টোবরের প্রথম দফায় ফ্লাভিও বোলসোনারো প্রায় ৫ কোটি ৫৮ লক্ষ ভোট বা প্রায় ৪৭ শতাংশ বৈধ ভোট পেয়েছেন। লুলার ভোট প্রায় ৫ কোটি ৩২ লক্ষ, অর্থাৎ ৪৪.৯ শতাংশ। কেউই ৫০ শতাংশ অতিক্রম করতে না পারায় ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় তাঁদের মুখোমুখি হতে হবে। প্রথম দফায় ফ্লাভিওর প্রায় দুই শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধান অনেকটা অপ্রত্যাশিত ছিল, কারণ অধিকাংশ প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা লুলাকে সামান্য এগিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সংখ্যার আড়ালে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো—কেন বোলসোনারোবাদ এখনও এত শক্তিশালী?এর উত্তর শুধুমাত্র ‘দক্ষিণপন্থী উত্থান’ বললে পাওয়া যাবে না। ব্রাজিলের সমাজে বহু বছর ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক অসন্তোষ, নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবিশ্বাস এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক মেরুকরণকে বুঝতে হবে। লুলা সরকার দারিদ্র্য ও বেকারত্ব কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখিয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক হতাশা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ এখনও প্রবল। বিভিন্ন সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও লুলা সরকারের সামাজিক সুরক্ষা ও ঋণ-সহায়তার উদ্যোগের পাশাপাশি উচ্চ সরকারি ঋণ, মন্থর অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে।এখানেই ব্রাজিলের নির্বাচনের শ্রেণিগত চরিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারের সূচক সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রার প্রকৃত ছবি দেয় না। একজন কৃষিশ্রমিক, শহরের অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, অ্যাপ-ভিত্তিক ডেলিভারি কর্মী, গৃহকর্মী কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে অর্থনীতির অর্থ হলো—মাসের শেষে কত টাকা হাতে থাকে, খাবারের দাম কত, ভাড়া কত, সন্তানকে স্কুলে পাঠানো সম্ভব কি না, স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া যায় কি না এবং অপরাধের ভয়ে সন্ধ্যার পর রাস্তায় বেরোনো যায় কি না।লুলার রাজনীতির ঐতিহাসিক শক্তি এখানেই। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ব্রাজিলের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ধাতুশিল্প শ্রমিক থেকে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, তারপর Workers' Party বা PT-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট—লুলার রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্বের দাবি। তাঁর সরকার Bolsa Família-র মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় সামাজিক বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিয়েছে। তাঁর সমর্থকদের কাছে রাষ্ট্রের এই পুনর্বণ্টনমূলক ভূমিকা ব্রাজিলের গভীর সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক হাতিয়ার।কিন্তু এখানেই লুলার রাজনীতির সীমাবদ্ধতাও সামনে আসে। লুলা নিজে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিনিধি নন। তাঁর রাজনৈতিক প্রকল্প মূলত সামাজিক গণতান্ত্রিক ও মধ্য-বামপন্থী—অর্থাৎ পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে ভেঙে ফেলার বদলে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, সামাজিক ব্যয়, শ্রমিকের অধিকার এবং পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে তার বৈষম্যমূলক প্রভাব কমানোর চেষ্টা। ফলে তাঁর সরকারকে একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যাশা এবং ব্যবসায়ী, কৃষি-পুঁজি, আর্থিক বাজার ও কংগ্রেসের রক্ষণশীল শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। এই দ্বৈততার ফলেই লুলার দ্বিতীয় দফার প্রচারে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসবে—তিনি কি শুধুমাত্র বোলসোনারোকে ঠেকানোর রাজনীতি করবেন, নাকি মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সংকটকে আরও শক্তিশালীভাবে রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করবেন?কারণ বোলসোনারোবাদ শুধু একটি আদর্শগত দক্ষিণপন্থী আন্দোলন নয়। এটি অসন্তোষকে রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত করতে পেরেছে। অপরাধ, মূল্যবৃদ্ধি, রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস, সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতা এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভকে তারা এক জায়গায় এনেছে। এই কারণেই প্রথম দফায় ফ্লাভিওর শক্তিশালী ফলকে শুধু ‘দক্ষিণপন্থী ভোট’ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। লুলার বিরুদ্ধে অসন্তুষ্ট কিছু ভোটারও ফ্লাভিওকে সমর্থন করেছেন; ‘প্রতিবাদী ভোট’ তাঁর প্রথম দফার ফলকে বাড়িয়ে দিতে পারে।এই ‘প্রতিবাদী ভোট’-এর সামাজিক উৎস অনুসন্ধান করা জরুরি। যখন শ্রমজীবী বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ মনে করেন যে রাষ্ট্র তাঁদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি সাধারণ মানুষের কথা শুনছে না, তখন তাঁদের একাংশ এমন রাজনৈতিক শক্তির দিকে যেতে পারেন, যারা সহজ ভাষায় ‘পরিবর্তন’-এর প্রতিশ্রুতি দেয়। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি সেই ক্ষোভকে প্রায়ই রাষ্ট্রের সামাজিক ব্যর্থতার পরিবর্তে ‘অপরাধী’, ‘অভিবাসী’, ‘বামপন্থী’, ‘এলিট’ বা অন্য কোনও রাজনৈতিক-সামাজিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দিতে পারে।ব্রাজিলে সেই প্রক্রিয়াটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরাধ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। একটি বিশাল, বৈষম্যপূর্ণ এবং দ্রুত নগরায়িত সমাজে অপরাধের ভয় বাস্তব। কিন্তু অপরাধের সামাজিক শিকড়—দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মাদক অর্থনীতি, শহুরে বৈষম্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি—এসব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা অনেক বেশি কঠিন। ‘কঠোর আইন’ বা ‘আরও পুলিশ’ সহজ রাজনৈতিক স্লোগান। কিন্তু অপরাধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উৎপত্তি মোকাবিলা করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল। বোলসোনারোবাদ এই সরলীকরণের রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু এই রাজনীতির বিপরীতে বামপন্থী বিশ্লেষণের মৌলিক প্রশ্ন হলো—নিরাপত্তা কি শুধুমাত্র পুলিশের বিষয়, নাকি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও বিষয়?ব্রাজিলের রাজনৈতিক সংঘাতের আরেকটি কেন্দ্র হলো কংগ্রেস বা সংসদ। প্রথম দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি দক্ষিণপন্থী দলগুলি কংগ্রেসের দুই কক্ষেই শক্তিশালী ফল করেছে। বোলসোনারোর Liberal Party বা PL Chamber of Deputies-এ সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠার পথে এবং Senate-এও তারা আসন বাড়িয়েছে। বোলসোনারো পরিবারের মিশেল বোলসোনারো ও কার্লোস বোলসোনারোর নির্বাচনী সাফল্যও দেখিয়েছে যে এই আন্দোলন কোনও এক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।এটি লুলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা। প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হওয়া আর রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। কংগ্রেসে শক্তিশালী রক্ষণশীল ব্লক থাকলে সামাজিক ব্যয়, শ্রমনীতি, পরিবেশনীতি, করব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মতো প্রশ্নে প্রেসিডেন্টকে ক্রমাগত সমঝোতা করতে হবে। কংগ্রেস ইতিমধ্যে সরকারি ব্যয় ও আইন প্রণয়নের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা কিছুটা সীমিত হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিগত প্রশ্ন উঠে আসে: রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর কার প্রভাব বেশি?নির্বাচিত সরকার যদি জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে, কিন্তু বাজেট, করনীতি, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর ব্যবসায়ী ও আর্থিক গোষ্ঠীর প্রভাব ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের নির্বাচনী কাঠামো অক্ষুণ্ণ থেকেও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র সীমিত হতে পারে। ব্রাজিলের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা প্রয়োজন। এই জায়গায় লুলা এবং ফ্লাভিওর মধ্যে পার্থক্য যেমন আছে, তেমনই কিছু অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতাও আছে। দুই শিবিরের রাজনৈতিক ভাষা তীব্রভাবে ভিন্ন হলেও বিনিয়োগকারীরা তাঁদের আর্থিক নীতির মধ্যে প্রত্যাশিত ব্যবধানকে খুব বড় বলে দেখছিলেন না; উভয় ক্ষেত্রেই সরকারি ঋণ বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ ছিল।অর্থাৎ ‘বাম বনাম দক্ষিণ’ দ্বন্দ্বের মধ্যেও পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়ে যায়। লুলা সামাজিক পুনর্বণ্টনকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিলেও তিনি ব্রাজিলের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি দিচ্ছেন না। অন্যদিকে ফ্লাভিওর রাজনৈতিক প্রকল্প আরও রক্ষণশীল হলেও তাঁকেও একই অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে কাজ করতে হবে। এই কারণেই ব্রাজিলের নির্বাচনকে শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক মেরুকরণের বদলে ‘রাষ্ট্র কোন শ্রেণির স্বার্থে কতটা কাজ করবে’—এই প্রশ্ন দিয়ে পড়া প্রয়োজন।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো কৃষি ও ভূমি। ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষি উৎপাদক এবং কৃষি-ব্যবসা বা agribusiness দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু একই সঙ্গে ভূমি বৈষম্য, কৃষিশ্রমিকের অধিকার, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার এবং অ্যামাজন বন সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিনের সংঘাত রয়েছে। ফলে পরিবেশনীতি কখনও শুধুমাত্র পরিবেশের প্রশ্ন নয়; তা ভূমি, সম্পদ, কৃষি-পুঁজি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত। লুলার পরিবেশনীতি আন্তর্জাতিক মহলে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, বিশেষত আমাজন রক্ষার প্রশ্নে। কিন্তু তাঁর সরকারকেও কৃষি-ব্যবসা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। ফলে বামপন্থী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি আরও গভীর: উন্নয়ন কার জন্য, এবং তার পরিবেশগত খরচ কে বহন করবে? ব্রাজিলের নির্বাচন তাই জলবায়ু রাজনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। আমাজন শুধু ব্রাজিলের সম্পদ নয়; বিশ্ব জলবায়ু ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আমাজন রক্ষার আন্তর্জাতিক আহ্বানের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা এবং ব্রাজিলের উন্নয়ন-আকাঙ্ক্ষার সংঘাতও বাস্তব। ভবিষ্যৎ সরকারকে এই দ্বন্দ্ব সামলাতে হবে।আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও শ্রেণি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লুলা নির্বাচনী প্রচারে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে এনেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে সতর্ক করেছেন। ফ্লাভিওর সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সম্পর্কও নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এখানে আবারও লাতিন আমেরিকার পুরনো রাজনৈতিক প্রশ্ন ফিরে আসে: একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র কি নিজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি নিজে নির্ধারণ করতে পারবে, নাকি বৃহৎ শক্তি, আন্তর্জাতিক পুঁজি ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার চাপ সেই সিদ্ধান্তকে সীমিত করবে? ব্রাজিলের মতো দেশের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি একই সঙ্গে BRICS-এর অন্যতম প্রধান শক্তি, চীনের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্কযুক্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে লুলার বহুপাক্ষিকতা এবং গ্লোবাল সাউথ-কেন্দ্রিক কূটনীতি একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ।অন্যদিকে বোলসোনারো পরিবারের রাজনীতি মার্কিন দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছে, তা ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে। এমনকি নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্রাজিলের দক্ষিণপন্থী সংগঠনগুলির দিকে অর্থপ্রবাহের অভিযোগ নিয়ে ব্রাজিল সরকার তদন্তের দাবি তুলেছিল। এই অভিযোগগুলি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে ত। তবু বৃহত্তর প্রশ্নটি থেকে যায়—লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থার পুনরুত্থান কি শুধুই সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতার ফল, নাকি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক হতাশারও ফল? সম্ভবত দুটিই কাজ করছে।বামপন্থী রাজনীতির জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। শুধু ‘ফ্যাসিবাদ ঠেকাও’ বা ‘দক্ষিণপন্থাকে প্রতিহত করো’—এই আহ্বান যথেষ্ট নয়। শ্রমজীবী মানুষের কাছে রাষ্ট্র কী দিচ্ছে, মজুরি কতটা বাড়ছে, বাসস্থান কতটা সুলভ, খাদ্য ও স্বাস্থ্য পরিষেবার দাম কত, শিক্ষা কতটা সহজলভ্য, কর্মসংস্থান কতটা নিরাপদ—এই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে না পারলে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণকে শুধুমাত্র মতাদর্শ দিয়ে মোকাবিলা করা কঠিন। লুলার রাজনৈতিক শক্তির ঐতিহাসিক ভিত্তি শ্রমিক শ্রেণি। কিন্তু ২০২৬-এর ব্রাজিলের শ্রমজগত ১৯৮০ বা ২০০০-এর দশকের ব্রাজিলের মতো নয়। গিগ অর্থনীতি, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রম, অস্থায়ী চাকরি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং নতুন শহুরে মধ্যবিত্ত একটি পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামো তৈরি করেছে। ফলে পুরনো ট্রেড ইউনিয়ন-ভিত্তিক সংগঠন এবং নতুন প্রজন্মের কর্মজগতের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সংযোগ তৈরি করা বাম রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।এই প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন শুধু লুলার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়; ব্রাজিলের বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করবে। লুলা যদি জয়ী হন, তবুও কংগ্রেসে শক্তিশালী দক্ষিণপন্থী উপস্থিতি, সামাজিক মেরুকরণ এবং বোলসোনারোবাদী আন্দোলনের বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি তাঁর সামনে থাকবে। আর ফ্লাভিও জয়ী হলে বোলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসবে।তবে প্রথম দফার ফল একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে এনেছে: বোলসোনারোবাদকে কেবল জাইর বোলসোনারোর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখা ভুল। তাঁর পুত্রের ৪৭ শতাংশ ভোট, কংগ্রেসে দক্ষিণপন্থীদের সাফল্য এবং বোলসোনারো পরিবারের একাধিক সদস্যের নির্বাচিত হওয়া দেখাচ্ছে যে এটি একটি সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। Al Jazeera-কে ইতিহাসবিদ Andre Pagliarini বলেছেন, আইনসভায় ডানপন্থী প্রার্থীদের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল বোলসোনারোবাদী প্রকল্পের গভীর সামাজিক ভিত্তির ইঙ্গিত দেয়।অন্যদিকে লুলার ক্ষেত্রেও একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন: তাঁর রাজনৈতিক শক্তি কেবল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। তা ব্রাজিলের শ্রমিক আন্দোলন, সামাজিক কল্যাণনীতি এবং রাষ্ট্রের পুনর্বণ্টনমূলক ভূমিকার দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে বাম রাজনীতির জায়গা আরও সংকুচিত হতে পারে।তাই ২৫ অক্টোবরের রান-অফকে শুধুমাত্র ‘লুলা বনাম ফ্লাভিও’ হিসেবে দেখা ব্রাজিলের গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ছোট করে দেখা হবে। আসল সংঘাত অনেক বিস্তৃত—রাষ্ট্রের সামাজিক ভূমিকা বনাম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক ভূমিকা, পুনর্বণ্টন বনাম অধিকতর বাজারনির্ভর নীতি, সামাজিক অধিকার বনাম সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতা, বহুপাক্ষিক সার্বভৌমত্ব বনাম যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক অভিমুখ এবং সর্বোপরি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের কোন অংশ কতটা পাবে সেই প্রশ্ন।প্রথম দফার ফল তাই কোনও একটি শিবিরের সম্পূর্ণ বিজয় নয়। এটি ব্রাজিলের গভীর বিভাজনের একটি রাজনৈতিক মানচিত্র। প্রায় ৫ কোটি ৩২ লক্ষ ভোট লুলার পক্ষে এবং প্রায় ৫ কোটি ৫৮ লক্ষ ভোট ফ্লাভিওর পক্ষে যাওয়ার অর্থ হলো, দেশের প্রায় অর্ধেক ভোটার এখনও লুলার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত, আর প্রায় সমপরিমাণ ভোটার বোলসোনারোবাদী ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছেন।এখন দ্বিতীয় দফায় যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে তা হলো—এই দুই বৃহৎ রাজনৈতিক শিবিরের বাইরে থাকা ভোটারদের অসন্তোষ কে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে। ফ্লাভিও যদি সেই অসন্তোষকে ‘পরিবর্তন’-এর ভাষায় নিজের দিকে টানতে চান, লুলার সামনে থাকবে সেই অসন্তোষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলির রাজনৈতিক সমাধান দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। ব্রাজিলের বামপন্থার জন্য এখানেই পরীক্ষাটি সবচেয়ে কঠিন। শুধু অতীতের লুলাকে ফিরিয়ে আনা নয়; নতুন ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের কাছে ভবিষ্যতের একটি বিশ্বাসযোগ্য সামাজিক চুক্তি হাজির করা। কারণ দক্ষিণপন্থার শক্তি শুধু তার মতাদর্শে নয়—অনেক সময় তার শক্তি তৈরি হয় বামপন্থা ও মধ্যপন্থী রাজনীতি মানুষের বাস্তব ক্ষোভকে যথেষ্ট দ্রুত ও গভীরভাবে রাজনৈতিক ভাষা দিতে না পারলে।
২৫ অক্টোবর তাই শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা নয়। এটি ব্রাজিলের রাজনৈতিক অর্থনীতির পরবর্তী অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ফল যাই হোক, প্রথম দফা ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে যে বোলসোনারোবাদকে পরাজিত করতে হলে শুধু একজন বোলসোনারোকে নির্বাচনে হারানো যথেষ্ট নয়; যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ তাকে শক্তি জোগাচ্ছে, তার মোকাবিলাও করতে হবে। আর সেই জায়গাতেই ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ বাম রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিহিত।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, দিল্লি