বাগেরহাট প্রতিনিধি: যাত্রীদের রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দিতে নির্মাণ করা হয়েছিল যাত্রী ছাউনি। কিন্তু বাগেরহাট শহরের অধিকাংশ যাত্রী ছাউনির বর্তমান চিত্র যেন সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও ফুটো টিন দিয়ে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ছে। কোথাও আবার পলিথিন দিয়ে পানি ঠেকানোর ব্যর্থ চেষ্টা চলছে। ভেঙে গেছে বসার স্থানও।
এর মধ্যেই কয়েকটি যাত্রী ছাউনিতে গড়ে উঠেছে চায়ের দোকান, মোটরসাইকেল ও রিকশার গ্যারেজসহ নানা স্থাপনা। পোস্টার-ব্যানারে ঢেকে যাওয়া কোনো কোনো ছাউনিকে দূর থেকে দেখলে যাত্রী ছাউনি নয়, বরং দোকান বলেই মনে হয়। ফলে যাত্রীদের রোদ-বৃষ্টিতে আশ্রয়ের জন্য নির্মিত স্থাপনাগুলোই এখন তাদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাগেরহাট বাসস্ট্যান্ডের যাত্রী ছাউনিটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ছাউনির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। বসার স্থানও বেহাল অবস্থায় রয়েছে।
বৃষ্টি হলে ফুটো টিনের বিভিন্ন অংশ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে। পানি ঠেকাতে ছাউনির ওপর কাগজ ও পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির সময় যাত্রীদের যেখানে আশ্রয় নেওয়ার কথা, সেখানে দাঁড়িয়েও ভিজতে হচ্ছে।
শুধু বাসস্ট্যান্ড নয়, নতুন জেলা কারাগারের সামনে ও দশানী পুলিশ বক্সের পাশের যাত্রী ছাউনির অবস্থাও শোচনীয়। দশানীর ছাউনির দুই পাশে গড়ে উঠেছে দোকান। এতে যাত্রীদের বসার জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
শহরের আরও কয়েকটি যাত্রী ছাউনিতেও বসার স্থান দখল করে ছোট ছোট দোকান পরিচালনা করতে দেখা গেছে। এতে যাত্রীদের জন্য নির্মিত স্থাপনাগুলোর মূল উদ্দেশ্যই অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে।
খানজাহান আলী মাজার এলাকায় সম্প্রতি নির্মিত যাত্রী ছাউনিতেও দেখা গেছে অপরিচ্ছন্নতার চিত্র। সেখানে যাত্রী ছাউনির ভিতরে পানের পিক ফেলবেন না এবং পানের পিক ফেললে ১০০ টাকা জরিমানার সতর্কবার্তা লেখা রয়েছে।
কিন্তু সেই সতর্কবার্তার ঠিক নিচেই দেয়ালজুড়ে পানের পিকের দাগ। নতুন একটি স্থাপনায় এমন অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ করলেই হবে না; নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও তদারকি নিশ্চিত না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই এসব স্থাপনা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
যাত্রী ছাউনিগুলোর এমন বেহাল দশায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় যানবাহনের অপেক্ষায় থাকা নারী, শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ আরও বেশি।
এক নারী যাত্রী আসমা বলেন, গ্রাম থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনে শহরে আসি। অনেক সময় যানবাহনের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু যাত্রী ছাউনিতে বসার ভালো ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টি হলে ভিজতে হয়, রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা, নারীদের জন্য শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা নেই। জরুরি প্রয়োজনে আমাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়
স্থানীয় বাসিন্দা আলম মোল্লা বলেন, বাগেরহাটের ট্রাফিক মোড়ের যাত্রী ছাউনিটি দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত সংস্কার না করলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যাত্রীদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নির্মিত এসব স্থাপনার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় একদিকে যেমন সেবার মান কমছে, অন্যদিকে জরাজীর্ণ কাঠামো যাত্রীদের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করছে।
যাত্রী ছাউনিতে গড়ে ওঠা দোকানগুলো নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। কয়েকজন দোকানদার দাবি করেন, এসব জায়গার জন্য তাদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হয়। কেউ কেউ জায়গা পেতে অর্থ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন।
তবে এসব দোকান কার অনুমোদনে চলছে, কে ভাড়া আদায় করছেন এবং জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নির্মিত স্থাপনা কীভাবে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
দোকানদার তহুরা বেগম বলেন, মা-মেয়ে মিলে দোকান চালাই। অনেক সময় লোকজন বাকিতে মাল নিয়ে টাকা দেয় না। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে প্রতিবাদও করতে পারি না।
আরেক দোকানদার শান্তা ইসলাম লিজার দাবি, যাত্রী ছাউনিতে দোকান করতে তাকে মাসিক ভাড়া দিতে হয়। মাঝে মাঝে বিভিন্ন লোক এসে টাকা দাবি করেন এবং টাকা না দিলে দোকান করতে দেবেন না বলে হুমকি দেন।
দোকানগুলো পরিচালনা ও ভাড়া আদায়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া গেলে এসব অভিযোগের প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। জরাজীর্ণ যাত্রী ছাউনিগুলো দ্রুত সংস্কার করা হবে। পৌরসভার মধ্যে কোনো যাত্রী ছাউনিতে দোকান বা অন্য স্থাপনা থাকলে সেগুলো সরিয়ে যাত্রীদের বসার উপযোগী করা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, শুধু জরাজীর্ণ যাত্রী ছাউনিগুলো সংস্কার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সংস্কারের পর এসব স্থাপনায় দোকান, গ্যারেজ বা অন্য কোনো অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করতে হবে।
পাশাপাশি নারী যাত্রীদের জন্য শৌচাগার, নিরাপদ বসার স্থান, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। যাত্রীদের রোদ-বৃষ্টি থেকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্মিত এসব ছাউনি যেন শেষ পর্যন্ত দোকান কিংবা গ্যারেজে পরিণত না হয়, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা গেলে বাগেরহাটের যাত্রী ছাউনিগুলো আবারও সাধারণ মানুষের প্রকৃত জনসেবায় ফিরে আসবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম