রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: বিপ্লবী ছাত্ররাজনীতি দিয়ে পথচলা শুরু। এরপর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্বে উঠে আসা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে ভিপি হওয়া এবং ধাপে ধাপে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেলেন রুহুল কবির রিজভী।
২০ আগস্ট ২০২৬ বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলের গঠনতন্ত্রের ৭(খ)(৬) ধারা অনুযায়ী তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং মনোনয়নটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।
এর আগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দলটির মহাসচিবের পদটি শূন্য হয়। এরপরই রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে।
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয় ছাত্রজীবনে। উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি বামপন্থি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। রাজশাহী সরকারি কলেজ শাখা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠার পর সংগঠনটিতে যোগ দেন রিজভী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক এবং পরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে উঠে আসেন। একপর্যায়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
ছাত্ররাজনীতির মাঠে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার পর ১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন রুহুল কবির রিজভী। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
রাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন তার রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে বিএনপি যখন রাজনৈতিকভাবে নানা চাপ ও সংকটের মধ্যে ছিল, তখন দলটির অন্যতম সক্রিয় মুখ হিসেবে সামনে ছিলেন রিজভী। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকা এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করার সময়ে প্রায় নিয়মিতই দলীয় কার্যালয়ে দেখা যেত তাকে।
রাজনৈতিক সংকট, দলীয় কর্মসূচি, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কিংবা সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি—প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরতেন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বক্তব্য দেওয়ার কারণে গণমাধ্যমে বিএনপির অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত হন রিজভী।
বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ রুহুল কবির রিজভী দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলের মুখপাত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
দলীয় কর্মসূচি, রাজনৈতিক আন্দোলন এবং দেশের সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করেছেন তিনি। দীর্ঘদিনের এই ভূমিকার কারণে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও তার পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়।
রুহুল কবির রিজভীর পৈতৃক নিবাস কুড়িগ্রাম জেলায়। তার রাজনৈতিক উত্থানে নিজ এলাকার মানুষের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ রয়েছে। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তার উঠে আসাকে কুড়িগ্রামের নেতাকর্মীরা নিজেদের জন্যও গর্বের বিষয় হিসেবে দেখেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে পড়াশোনা করেন এবং ইতিহাস বিষয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিও লাভ করেন।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন রিজভী। তিনি দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৫ আগস্ট ২০২৬ বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয় তাকে। এর মাত্র কয়েকদিন পর, ২০ আগস্ট, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়।
এভাবে অল্প সময়ের ব্যবধানে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পাওয়ার পর সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক দায়িত্বও তার ওপর এসে পড়ে।
বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্রনেতা থেকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্ব, রাকসুর ভিপি, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি, বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, দীর্ঘদিনের দলীয় মুখপাত্র এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে রুহুল কবির রিজভী এবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে।
রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলায় নানা আন্দোলন, সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দলটির পক্ষে সক্রিয় থাকা রিজভীর জন্য নতুন এই দায়িত্বকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার নতুন দায়িত্বকে ঘিরে নিজ এলাকা কুড়িগ্রামসহ বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও সন্তোষ দেখা দিয়েছে।
এখন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবির রিজভীর সামনে রয়েছে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা এবং দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার নতুন অধ্যায়।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম