নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে দলীয়করণ না করার আহ্বান ও জুলাই জাদুঘরকে স্বায়ত্তশাসিত জাদুঘর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আইন করার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে তিনি এ জাদুঘরে সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যাকাণ্ড এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি-সংবলিত বিভিন্ন উপাদান সরিয়ে ফেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে এনসিপির ৫০ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে জুলাই জাদুঘর পরিদর্শনে গিয়ে এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন নাহিদ। এর আগে তারা জাদুঘরে এলে তাদের স্বাগত জানান জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব। তিনি প্রতিনিধি দলের সদস্যদের জাদুঘরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখান। এনসিপি নেতারাও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার বিভিন্ন স্মারক, ছবি, দলিল ও ঐতিহাসিক নিদর্শন পরিদর্শন করেন। জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরার গুরুত্বের ওপরও জোর দেন।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘরকে স্বায়ত্তশাসিত কাঠামো দেওয়া দরকার। এখানে অন্তত ২০০ জনবল প্রয়োজন। কিন্তু ১২-১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে এটি পরিচালিত হচ্ছে। ফলে জাদুঘরটি ঝুঁকিতে রয়েছে। গণভবন দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, যাকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ‘৩৬ জুলাই’ বলা হয়, ছাত্র-জনতা গণভবনে প্রবেশ করে এটিকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করে এবং সেখানে বিজয় উদযাপন করে। গত ১৬ বছর ধরে নির্যাতন, নির্মমতা, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল এই গণভবন।
তিনি বলেন, তিনি বলেন, এখান থেকেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন। মানুষের ওপর নির্যাতন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, অর্থনৈতিক লুটপাট ও দুর্নীতিসহ গত ১৬ বছরে দেশে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সঙ্গে গণভবনের একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে নির্যাতন, মানুষের প্রতিরোধ ও বিজয়ের স্মৃতিচিহ্ন ধারণকারী এই স্থানকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই জাদুঘরের কাজ অনেকটা শেষ হয়েছিল এবং এটি উদ্বোধনের উপযোগী হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আরও প্রায় পাঁচ মাস সময় লেগেছে। জাদুঘরটি দ্রুত খুলে দেওয়ার জন্য তারা সংসদে ও সংসদের বাইরে একাধিকবার কথা বলেছেন। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে তিনি সালাউদ্দিন আহমেদ ও বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ জাদুঘরটি পরিদর্শন করেছিলেন বলেও জানান।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এবারের পরিদর্শনে কিছু পরিবর্তন চোখে পড়েছে। সীমান্ত হত্যা নিয়ে থাকা একটি অংশ এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু স্মৃতিচিত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশিদের একটি তালিকা ছিল এবং ফেলানী হত্যাকাণ্ডের স্মরণে একটি ভাস্কর্যও ছিল। এসব উপাদান এখন আর সেখানে নেই।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ইতিহাসের অংশ হলে সেটি কেন থাকবে না? গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্কের বিষয়টিও ইতিহাসের অংশ। কিন্তু জাদুঘরের বর্তমান উপস্থাপনায় সেই বিষয়টি যথেষ্টভাবে উঠে আসেনি। একই সঙ্গে জাদুঘরে বিএনপির নির্যাতনের ইতিহাস নিয়ে থাকা বিষয়বস্তু বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান নাহিদ ইসলাম। তার মতে, বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর গত ১৬ বছরে যে নির্যাতন হয়েছে, সেসব বিষয়বস্তুর পরিমাণ এবার বেড়েছে এবং এর সঙ্গে কিছুটা দলীয় বক্তব্য ও বয়ানও যুক্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এখানে দলীয় কোনো কিছু জাতে হাইলাইট না হয়, জাতীয় বিষয়গুলোই যেন থাকে সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখতে হবে। জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা রাখা ঢাকার বাইরের স্কুল-কলেজগুলোর কোন নিদর্শন এখানে রাখা হয়নি। এই জাদুঘরকে যাতে আরও শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করা যায় সেই দিকে সরকারকে লক্ষ্য রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
রিপোর্টার্স২৪/এম এইচ