রিপোর্টার্স ডেস্ক: আটলান্টিক মহাসাগরে চলমান একটি বিলাসবহুল প্রমোদতরিতে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নতুন করে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের ওই জাহাজে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, আক্রান্তদের মধ্যে অন্তত একজনের শরীরে হান্টাভাইরাসের অ্যান্ডিস স্ট্রেইন শনাক্ত হয়েছে, যা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম।
তবে পরিস্থিতিকে এখনই মহামারির সূচনা হিসেবে দেখছে না ডব্লিউএইচও। সংস্থাটি বলছে, সাধারণ জনগণের জন্য ঝুঁকি এখনও কম।
কীভাবে শুরু হলো প্রাদুর্ভাব?
গত ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করে বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ এমভি হন্ডিয়াস। আটলান্টিকের দুর্গম অঞ্চল ঘুরে দেখানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা করা এই জাহাজে ২৮টি দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন।
১১ এপ্রিল জাহাজে এক ডাচ নাগরিকের মৃত্যু হয়। পরে তার স্ত্রীকেও দক্ষিণ আফ্রিকায় হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করেছে, তিনি হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। এরপর ২ মে এক জার্মান যাত্রীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় তিনজনে।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আক্রান্তদের শরীরে অ্যান্ডিস স্ট্রেইনের হান্টাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এই ধরনটি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে।
জাহাজটি সেন্ট হেলেনা, কেপ ভার্দে হয়ে বর্তমানে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে জাহাজ থেকে নামা বিভিন্ন দেশের যাত্রীদের শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে।
হান্টাভাইরাস কী?
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। ইঁদুরের মল, প্রস্রাব বা লালা শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেলে শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত অপরিষ্কার গুদামঘর, বেসমেন্ট, পুরোনো বাড়ি বা ইঁদুরের উপদ্রব আছে এমন স্থানে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। বিরল ক্ষেত্রে ইঁদুরের কামড় বা আঁচড় থেকেও সংক্রমণ হতে পারে।
কী ধরনের রোগ সৃষ্টি করে?
হান্টাভাইরাসে সাধারণত দুটি গুরুতর রোগ দেখা যায়—
১. হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (HPS): এতে প্রথমে জ্বর, ক্লান্তি ও পেশিতে ব্যথা দেখা দেয়। পরে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, কাশি ও ফুসফুসে জটিলতা তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি বলছে, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতা শুরু হলে মৃত্যুহার প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
২. হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (HFRS): এটি কিডনিকে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত করে। এতে নিম্ন রক্তচাপ, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ এবং কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিশ্বে কতটা ছড়িয়েছে?
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় দেড় লাখ মানুষ গুরুতর হান্টাভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত হন। এর বড় অংশই ইউরোপ ও এশিয়ায়, বিশেষ করে চীনে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ৮৯০টি কেস শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাসটি নতুন নয়। তবে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ঘটনা খুবই বিরল হওয়ায় সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবটি বাড়তি নজর কাড়ছে।
চিকিৎসা আছে কি?
হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখনো নেই। চিকিৎসকরা মূলত উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেন। গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে অক্সিজেন থেরাপি, ভেন্টিলেশন, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ কিংবা ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে। অনেক সময় রোগীকে আইসিইউতেও রাখতে হয়।
কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই ভাইরাস কোভিড-১৯ বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সহজে ছড়ায় না। ডব্লিউএইচওর সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যান কেরখোভে বলেছেন, “এটি কোভিড নয়, এটি ইনফ্লুয়েঞ্জাও নয়। এটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ছড়ায়।”
তার মতে, অ্যান্ডিস স্ট্রেইনের ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘসময় সংস্পর্শে থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক মহামারির আশঙ্কা কম। তবে ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে বলে আরও কিছু সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কীভাবে সতর্ক থাকবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়ি বা কর্মস্থলে ইঁদুরের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, ইঁদুর ঢোকার সম্ভাব্য পথ বন্ধ করতে হবে, ইঁদুরের মল পরিষ্কারের সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে, অপরিষ্কার বা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ঘর পরিষ্কারে সতর্ক থাকতে হবে’ জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
বিশ্বজুড়ে নতুন এই প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয়—সতর্কতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব