শিমুল চৌধুরী ধ্রুব: বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমন কিছু গ্রুপ সক্রিয় থাকার প্রমাণ মিলেছে, যেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশুদের ছবি পোস্ট করে তাদের নিয়ে আপত্তিকর ও বিকৃত আলোচনা করা হচ্ছে। একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব গ্রুপের অনেকগুলোই গত দুই বছরের মধ্যে তৈরি হয়েছে এবং সদস্যসংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে।
গ্রুপগুলোর পোস্টে সাধারণত ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী কন্যাশিশুদের ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ছবির বেশিরভাগই স্কুল ড্রেস বা সাধারণ সামাজিক অনুষ্ঠানে তোলা। এরপর সেই ছবিগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অশালীন মন্তব্য করা হচ্ছে এবং কখনও কখনও শিশুদের নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আলোচনা দেখা যাচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পোস্টের মন্তব্যে অধিকাংশ ব্যবহারকারী যৌন উৎসাহমূলক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে, যদিও অল্প কিছু মানুষ এর প্রতিবাদ করেছেন। আবার কিছু গ্রুপে ভুয়া প্রোফাইল ব্যবহার করে কন্যাশিশুর পরিচয়ে অন্যদের ইনবক্সে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হচ্ছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে যে এই ধরনের নেটওয়ার্ক শুধু প্রকাশ্য গ্রুপেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ব্যক্তিগত মেসেজিং প্ল্যাটফর্মেও ছড়িয়ে পড়ছে।
বাড়ছে শিশু নির্যাতনের আশঙ্কা
সম্প্রতি দেশে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার কয়েকটি ঘটনা সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাত বছরের এক শিশুকে অপহরণ করে ধর্ষণের চেষ্টা এবং হত্যাচেষ্টার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়।
এছাড়া গত এক মাসে, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে আরও চারটি এমন ঘটনা জনসমক্ষে এসেছে। পাবনায় এক ১৫ বছরের কিশোরী, নরসিংদীতে আরেক ১৫ বছরের কিশোরী, খুলনায় ৮ বছরের এক শিশু এবং যশোরে ৭ বছরের এক শিশু এই পাশবিকতার শিকার হয়েছে। এই কয়েকটা ঘটনা সংবাদপত্রে এসেছে। আড়ালে রয়ে গেছে আরো অনেক, তার সংখ্যা কারো জানা নেই!
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশু ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। শুধু এক বছরের (২০২৫) প্রথম সাত মাসেই ৩০৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ জন ছিল ০ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশু, ৯৪ জনের বয়স ছিল ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে এবং ১০৩ জন ছিল কিশোরী। ৬০টি ক্ষেত্রে বয়স সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। একই সময়ে ৩০ জন ছেলেও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশে এই পেডোফিলিক অপরাধ এতো ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে, যা নিয়ে ইউনিসেফও বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশে ইউনিসেফের এক প্রতিনিধি সাম্প্রতিক শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো নিয়ে বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশে শিশুদের ওপর, বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার হার যেভাবে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, তাতে আমি গভীরভাবে আতঙ্কিত। শিশু ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার সাম্প্রতিক ভয়াবহ এই উল্লম্ফন আমাকে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করছে। এসব ঘটছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো জায়গাগুলোতেও, যে জায়গা কিনা মূলত শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশের স্থান হওয়ার কথা ছিল।’
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
ইউএস-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রুবিনা হোসেন বলেন, এ ধরনের অনলাইন গ্রুপগুলো সমাজের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যখন সমমনা বিকৃত মানসিকতার মানুষরা একই প্ল্যাটফর্মে একত্রিত হয়, তখন তারা নিজেদের আচরণকে স্বাভাবিক বলে মনে করতে শুরু করে এবং তা বাস্তব অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়।
তিনি তার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের মিলিনিয়াল প্রজন্মের অন্তত ৭০ শতাংশ মেয়ে এই ধরণের মানুষদের (পেডোফাইল) মুখোমুখি হয়েছে—সেটা হোক আত্মীয়-স্বজন, দারোয়ান কিংবা চালক। তাদের বেশিরভাগই এই যন্ত্রণার কথা গোপন রেখেছে। আর যারা এই অপরাধগুলো করেছিল, তারাও তাদের গোপন পাপ নিয়েই মারা গেছে। কিন্তু এখন তাদের কাছে এমন প্ল্যাটফর্ম আছে যেখানে তারা এই সব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন রিপোর্টার্স২৪-কে বলেন, বাংলাদেশে বেশ কিছু পেডোফিলিয়া গ্রুপ সক্রিয় থাকার খবর পাওয়া গেছে। পেডোফিলিয়া একটি স্বীকৃত মানসিক ব্যাধি। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেমন মাদকের প্রতি তীব্র টান অনুভব করেন, তেমনি এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন।’
আইনি সীমাবদ্ধতা
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারান মো. আরাফ বলেন, ‘পেডোফিলিক কর্মকাণ্ড অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও কিছু ক্ষেত্রে এখনো অস্পষ্টতা বা ‘গ্রে এরিয়া’ রয়ে গেছে। ভুক্তভোগী ছেলে হোক বা মেয়ে, পেডোফিলিক কর্মকাণ্ড দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে সাইবার জগতে পেডোফিলিক উদ্দেশ্য বা মানসিকতা চর্চা করার বিষয়টি এখনো একটি অস্পষ্ট আইনি এলাকা। এটি নীতিগত ও নৈতিকভাবে ভুল। কিন্তু এর জন্য এখনো কোনো বিশেষ বিচার প্রক্রিয়া নেই।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড লবি ডিরেক্টর এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দীপ্তি শিকদার বলেন, বাংলাদেশে অনলাইনে পেডোফিলিক উদ্দেশ্যে নেটওয়ার্ক তৈরি বা আলোচনা করার বিষয়টি নিয়ে এখনো স্পষ্ট আইনি কাঠামো নেই। যদিও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়, তবে সব ধরনের কনটেন্ট এই আইনের আওতায় পড়ে না। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছে।
সচেতনতার প্রয়োজন
সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কারও ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ছবি ব্যবহার করে আপত্তিকর আলোচনা করা গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। শিশুদের ছবি কোথায় ও কীভাবে শেয়ার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা এবং সন্দেহজনক কোনো অনলাইন কার্যক্রম দেখলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব