আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি : শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি মার্কিন সাবমেরিন টর্পেডোর আঘাতে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ।
বুধবার পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ বলেন, ইরানি যুদ্ধজাহাজের ওপর এই হামলাটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো শত্রুর ওপর এ ধরনের প্রথম আক্রমণ।
ভারত মহাসাগরে এক রহস্যময় এবং ভয়াবহ বিপর্যয়ের কবলে পড়ে ডুবে গেল ইরানি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ 'আইআরআইএস ডেনা'। বুধবার শ্রীলঙ্কার উপকূল থেকে প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই মউডজ-ক্লাস ফ্রিগেটটি একটি জরুরি বিপদ সংকেত বা 'ডিস্ট্রেস কল' পাঠানোর পরই সমুদ্রে তলিয়ে যায়। জাহাজটিতে প্রায় ১৮০ জন ক্রু সদস্য ছিলেন বলে জানা গেছে।
শ্রীলঙ্কার কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে এবং সমুদ্র থেকে বেশ কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের বর্তমানে দক্ষিণ শ্রীলঙ্কার গালে শহরের একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে নিখোঁজদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে; শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও নৌবাহিনীর কিছু সূত্র জানিয়েছে যে অন্তত ১০১ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যদিও নৌবাহিনীর মুখপাত্র এই সংখ্যাটি নির্ভুল নয় বলে দাবি করেছেন। এই নৌ-বিপর্যয়টি এমন এক সময়ে ঘটল যখন সম্প্রতি ভারতে আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ ২০২৬’-এ অংশ নিয়ে জাহাজটি নিজ দেশে ফিরছিল। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই ভারতের ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড জাহাজটিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ পার্লামেন্টে জানিয়েছেন যে, জাহাজটি ডুবে যাওয়ার সময় শ্রীলঙ্কার জলসীমার বাইরে থাকলেও মানবিক কারণে কলম্বো দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের উদ্ধারকারী দল পাঠায়। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী যৌথভাবে এই উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে। নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিপদ সংকেত পাওয়ার সময় আশেপাশে অন্য কোনো জাহাজের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি এবং বিমানবাহিনীও আকাশে কোনো অস্বাভাবিক তৎপরতা দেখেনি। জাহাজটির ডুবে যাওয়ার কারণ নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক জল্পনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা দপ্তরের কিছু অভ্যন্তরীণ সূত্র দাবি করেছে যে, একটি সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ থেকে হামলার কারণে আইআরআইএস ডেনা ডুবে গেছে। তবে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর মুখপাত্র এই হামলার খবরটি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন যে, জাহাজটি ডুবে যাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনই কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তাদের এখনকার প্রধান অগ্রাধিকার হলো নিখোঁজদের উদ্ধার করা এবং প্রাণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পরই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু হবে। বৈশ্বিক উত্তেজনার এই আবহে এবং ভারতের বহুজাতিক নৌ-মহড়ায় অংশগ্রহণের পরপরই এই আধুনিক যুদ্ধজাহাজটির সলিল সমাধি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলে বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর ব্ল্যাক বক্স এবং বেঁচে ফেরা ক্রু সদস্যদের বয়ান রেকর্ড করার পরই চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
ইরান এই মুহূর্তে সরাসরি কোনো পক্ষকে দায়ী করা থেকে বিরত থাকলেও, তাদের সামরিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে এই ঘটনাকে একটি "রহস্যময় ট্র্যাজেডি" হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি