রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: সন্তান জন্মের সময় স্ত্রীর পাশে থাকার জন্য ছুটি চেয়েছিলেন পুলিশ অফিসার। কাঙ্ক্ষিত সময়ে ছুটি মেলেনি। আর সেই ফাঁকে পৃথিবীতে এসেই নিভে গেছে ছোট্ট একটি জীবন। ঢাকায় দায়িত্বরত অবস্থায় সন্তানের জন্ম ও মৃত্যুর খবর পান পুলিশ সদস্য মেহেদী হাসান। তবে ছেলের লাশ দাফনের জন্য আর ছুটির অপেক্ষা করেননি।
গত শনিবার রাতে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন পুলিশ সদস্য মেহেদী হাসান। ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ছুটি চাইছিলাম পাইলাম না। আমার ছেলেটা মারা গেল!!! ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশ। আমি না থাকলে নির্বাচন আটকে যেত!! কী জবাব দিব বউকে???’
পোস্টটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। এর পরদিন রোববার আরেকটি পোস্টে মেহেদী লিখেছেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজটি করে আসলাম, পিতা হয়ে পুত্রকে চিরবিদায় দিয়ে আসলাম…ওকে যখন বুকে জড়িয়ে ধরলাম, কোনোভাবেই মানতে পারছিলাম না যে সে আমাকে বাবা ডাকবে না।’
রাজধানীর ভাষানটেক থানার সহকারী উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান সন্তানের জন্মের সময় স্ত্রীর পাশে থাকতে পারেননি। ঢাকায় দায়িত্বরত অবস্থায় তিনি সন্তানের জন্ম ও এর পরপরই মৃত্যুর খবর পান। এরপর ছুটি ছাড়াই গভীর রাতে ঢাকা থেকে রওনা দেন ময়মনসিংহে। সকালে দাফন করেন নবজাতক পুত্রকে।
স্ত্রী আগে থেকেই বলেছিল, এবার সন্তান জন্মের সময় তাঁর পাশে না থাকলে সন্তানের মুখ দেখতে দেবে না। হলোও তা–ই। জীবিত সন্তানের মুখ দেখতে পেলাম না, দেখতে পেলাম মৃত সন্তানের মুখ।
পুলিশ সদস্য মেহেদী হাসানের ছুটির না পাওয়ার গল্প :
মেহেদী হাসানের স্বজন ও সহকর্মীরা বলেন, সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ জানিয়ে মেহেদী আগেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ছুটির প্রয়োজনের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের কথা বলে কর্তৃপক্ষ তাঁকে মাত্র দুই দিনের ছুটি নিতে বলে। এ সময় মেহেদী বলেছিলেন, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম হলে হাসপাতাল থেকে স্ত্রী ও সন্তানকে বাসায় নিতে অন্তত তিন দিন ছুটি প্রয়োজন। তাই তিনি পাঁচ থেকে সাত দিনের ছুটি চান। তখন তাঁকে জানানো হয়, এত দিনের ছুটি দেওয়া সম্ভব নয়। এই ক্ষোভে মেহেদী আর ছুটির জন্য লিখিত আবেদন করেননি।
ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দেওয়া প্রসঙ্গে মেহেদী বলেন, ‘সন্তানের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর যা মনে হয়েছে তাই করেছি। ফেসবুকে একটার পর একটা স্ট্যাটাস দিয়েছি। স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে। আমি গতকাল (শনিবার) রাতেই ময়মনসিংহ রওনা দিই। আজ (রোববার) ছেলের দাফন করলাম।’
মেহেদী হাসানের সঙ্গে ঢাকায় ছিলেন তাঁর স্ত্রী। কিছুদিন আগে ছুটি নিয়ে স্ত্রীকে ময়মনসিংহে রেখে এসেছিলেন। ২ ফেব্রুয়ারি স্ত্রীর সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ ছিল। মেহেদী হাসান তাই আগে থেকেই ছুটির কথা জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া এবার নির্বাচনে দায়িত্বের তালিকায় তাঁর নামও নেই। তাই ভেবেছিলেন ছুটি পেতে সমস্যা হবে না।
ভাষানটেক থানায় মেহেদী হাসান গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। চলতি বছরের পাওনা ২০ দিন ছুটির মধ্যে তিনি স্ত্রীকে ময়মনসিংহে রেখে আসাসহ ৫ দিন ছুটি কাটিয়েছেন।
মেহেদী হাসান বলেন, ছুটির জন্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে (ওসি) গেলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তারপর তিনি ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তাকে ছুটির বিষয়টি জানিয়ে বলেন, বাড়িতে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই কন্যা ছাড়া আর কেউ নেই। তখন ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দুই দিনের ছুটি নিতে বলেন। কিন্তু আবার বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে গেলে ওই কর্মকর্তা সাফ জানিয়ে দেন—‘কোনো ছুটি হবে না।’
তবে প্রথমে ছুটি না পেলেও নবজাতক সন্তানের মৃত্যুর পর মেহেদী হাসানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে জানিয়েছেন, ছুটি নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। তাঁরাই ছুটির ব্যবস্থা করবেন বলে উল্লেখ করেন মেহেদী হাসান।
প্রথমে ছুটি না পেলেও নবজাতক সন্তানের মৃত্যুর পর মেহেদী হাসানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে জানিয়েছেন, ছুটি নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।
প্রথম আলো থেকে নেয়া
রিপোর্টার্স২৪/এসএন